বাঙালির পহেলা বৈশাখ ॥ উৎসব বরণে ব্যস্ত ঢাবির চারুকলাসহ সারাদেশ

শষ্যের মাস বৈশাখ। এ মাসের প্রথম দিনটি থেকেই শুরু হয় বর্ষপঞ্জিকার আবর্তনের দৌড়। ফলে বছরের প্রথম এই দিনটি উৎসবেরও। উদ্দীপনা, উচ্ছ্বাস, আবেগ আর উল্লাসে ওইদিন ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সমগ্র বাঙালি জাতিসত্তার গভীরতর আত্মিক মেলবন্ধনে মেতে উঠবে এক আনন্দ উৎসবে। সকল সাম্প্রদায়িক অপশক্তিসহ যে কোনো সংকটে যা প্রত্যয় যুগিয়ে আসছে যুগ থেকে যুগান্তর।

‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো’ রবীন্দ্রনাথের এই গানের সঙ্গে চির নতুনের ডাকে পহেলা বৈশাখের ভোরে জেগে উঠবে নগর-গ্রাম-মফস্বল। বাঙালির এই অসাম্প্রদায়িক উৎসবে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ সব ধর্মের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ বাংলা নববর্ষবরণে জেগে উঠবে প্রাণের আনন্দে আর আবেগের উচ্ছলতায়। রমনায় গান ও চারুকলায় আনন্দ মিছিলের পাশাপাশি রাজপথে নাগরিকদের জটলা পহেলা বৈশাখকে করে তুলবে আনন্দ ও সুষমামণ্ডিত।

পান্তার সঙ্গে ইলিশের স্বাদে বাঙালির পহেলা বৈশাখের আনন্দের ঢেউ আছড়ে পড়বে গ্রাম থেকে নগরে, শহর থেকে বন্দরে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এদিন বৈশাখ ও বাঙালিয়ানার উন্মাদনায় মেতে উঠবে সমগ্র বাঙালি।

তবে এ উৎসবকে আরো বেশি রঙিন করে তুলতে এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ছাত্র-শিক্ষকরা। বৈশাখ না এলেও কালবৈশাখীর তাণ্ডবে কিছুটা বিঘ্ন ঘটলেও পুরো আয়োজন শেষ করতে বদ্ধপরিকর আয়োজকরা।

পহেলা বৈশাখে শোভাযাত্রায় বাঙালি ঐতিহ্য তুলে ধরতে এরই মধ্যে কাজ শুরু হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে। আবহমান বাংলার সব চিত্রই যেন নানা কর্মের মাধ্যমে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন তারা।

সরেজমিন চারুকলা অনুষদে গিয়ে দেখা যায়, শোভাযাত্রাকে কেন্দ্র করে সব আয়োজন সফলভাবে সম্পন্ন করতে সেখানে কাজ করছেন চারুকলা বিভাগের অর্ধশত শিক্ষার্থী ব্যস্ত আছেন বিভিন্ন ধরনের শিল্পকর্ম তৈরিতে। বিশালাকৃতির হাতি, পুতুল, কুমির, ঘোড়া, বিচিত্র মুখোশ, পাপেট, বাঘের প্রতিকৃতি ও নৌকা ইত্যাদি তৈরিতে করছেন শিক্ষার্থীরা। নির্দিষ্ট দিনের আগেই কাজ শেষ করতে দিন-রাত পরিশ্রম করছেন এসব শিক্ষার্থী। খুব সুন্দরভাবে কাজও হচ্ছে।

শোভাযাত্রার অর্থ সংগ্রহ করা হয় প্রতিকৃতি বিক্রির মাধ্যমে। দিন গড়ালে প্রতিকৃতির বিক্রি বাড়বে বলে মনে করছেন শিক্ষার্থীরা। তারা বলেন, একেকটা জিনিস তৈরিতে ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা খরচ হয়। আমরা বাইরে থেকে কোনো স্পন্সর নেই না। তাই প্রতিকৃতি বিক্রির মাধ্যমেই আমাদের এই টাকা সংগ্রহ করতে হয়।

অপরদিকে এই আয়োজন এরইমধ্যে বৈশ্বিক স্বীকৃতি পেয়েছে। একে সবচেয়ে বড় আনন্দ আয়োজন বলে মনে করেন আয়োজকরা এবং এর পাশাপাশি এই শোভাযাত্রাটির ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে তারা বলেন, ‘প্রতি বছর বাংলা নববর্ষকে বরণ করে নিতে ঢাকার রমনা পার্কে ছায়ানট আয়োজিত প্রাত্যোষিক সঙ্গীতানুষ্ঠান এবং একে ঘিরে আয়োজিত অন্যান্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও মেলা সাধারণ মানুষকে নিবিড়ভাবে আকৃষ্ট করতে থাকে এবং গ্রামীণ বাংলার জনগোষ্ঠীর কৃষিভিত্তিক সমাজের ঐতিহ্যকে সমকালীন নাগরিক আবহে সার্বজনীন পহেলা বৈশাখ উদযাপনে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে।’

তারা আরো বলেন, ১৯৮০’র দশকে স্বৈরাচারী শাসনের বিরূদ্ধে সাধারণ মানুষের ঐক্য এবং একইসঙ্গে শান্তির বিজয় ও অপশক্তির অবসান কামনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইন্সটিটিউটের উদ্যোগে ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দে সর্বপ্রথম মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রবর্তন হয়। ঐ বছরই ঢাকাবাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয় এই আনন্দ শোভাযাত্রা।

এই প্রেক্ষিতে ড. নিসার হোসেন জানান, ‘১৯৮৯ সালে চারুকলা অনুষদ থেকে প্রথম শোভাযাত্রা বের হয়। ২০১৬ সালে ইউনেস্কো এ শোভাযাত্রাকে বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি দিয়েছে। এ জন্য এ বছরের আয়োজনকে তাঁরা বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন এবং বাঙালি জাতির এই চেতনাকে ধারণ করে তরুণেরা সত্য, সুন্দরের দিকে এগিয়ে যাবে বলে আশা করেন তিনি।’

অন্যদিকে বাংলা সনের প্রথম দিন সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইন্সটিটিউটের শিক্ষক-শিক্ষার্থীগণ পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে এই আনন্দ শোভাযাত্রা বের করার উদ্যোগ প্রতি বছর অব্যাহত রাখে। পাশাপাশি পুরান ঢাকাসহ রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় বসে নাগরিক জীবনের ‘পহেলা বৈশাখ মেলা’।

তবে বাঙালির সাংস্কৃতিক ইতিহাস থেকে জানা যায়, মোগল সম্রাট আকবর ১৫৮৪ সালের ১০ কিংবা ১১ মার্চ ফসলি সন হিসেবে বৈশাখ মাসকে বাংলাবর্ষের প্রথম ধরে বাংলা বর্ষপঞ্জি প্রবর্তন করেন। তবে বর্ষপঞ্জিটি কার্যকর হয় তার সিংহাসনে বসার সময় ৫ নভেম্বর ১৫৫৬ সালের হিসাব ধরে। তখন থেকেই বাংলা নববর্ষ আর্তব উৎসব বা ঋতুধর্মী উৎসব হিসেবে পালিত হতো। অপরদিকে ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে প্রথম মহাযুদ্ধ চলার সময়ও বাংলায় বছরের প্রথম দিন থেকেই বৈশাখী মেলা আয়োজনের তথ্য পাওয়া যায়। তবে ১৯৬৭ সালের আগে বিপুল আয়োজনে পহেলা বৈশাখ পালনের রীতি তেমন জনপ্রিয় হয়নি।

উল্লেখ্য, ১৯৮৯ সালে চারুকলা অনুষদের উদ্যোগে প্রথমবারের মতো আনন্দ শোভাযাত্রা বের করা হয়। এরপর এই আয়োজন বাংলা বর্ষবরণের অপরিহার্য উপাদান হয়ে উঠে। ১৯৯৬ সালে চারুকলার এ আনন্দ শোভাযাত্রাকে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামকরণ করা হয়। ২০১৬ সালের নভেম্বরে জাতিসংঘের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও বিজ্ঞান-বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কোর ‘ইনটেনজিবল হেরিটেজ’ হিসেবে স্বীকৃতি পায় মঙ্গল শোভাযাত্রা।

লেখকঃ প্রশান্ত কর্মকার

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.