“পালের নাও, পালের নাও, পান খাইয়া যাও, পালের নাও”

পান বর্তমান সমাজে বহুল প্রচলিত একটি পাতার নাম। পানের আরেকটি নাম হচ্ছে “তাম্বুল”। সংস্কৃত ভাষা “তাম্র ” থেকে তাম্বুল শব্দটি এসেছে।

চায়ের দেশ আমাদের সিলেট কিন্তু আকর্ষনীয় কথা হচ্ছে শুধু চা নয় পান এর জন্য ও বিখ্যাত আমাদের পূর্ণভুমি সিলেট।

নিঃশ্বাসকে সুরিভিত করা এবং ঠোঁট ও জিহ্বাকে লাল করার জন্য সিলেটিরা সুপারির সাথে পান মিশিয়ে খেয়ে থাকেন। চা অথবা যে কোন খাবারের পর অনেক লোক পান খেয়ে থাকেন। আবার পান খাওয়া অনেকের নেশা ও বটে।

যখন এক জন লোক পান খান তখন অনেক ঘ্রান হয়, মনে হয় এতো সুস্বাদু খাবার খাচ্ছে। যারা পান খান না, তাদেরও স্বাদ জাগে পান খাওয়ার। পানখোরদের দেখতে কিন্তু অসাধারণ লাগে, মন চায় শুধু তাকিয়ে থাকি, আহা কি সুন্দর।

পান খেয়ে খেয়ে যখন মানুষ কথা বলে তখন মনে হয় তারা কি না স্বাদ পায়, দেখতে কিন্তু খুবই ভালো লাগে। পান না খাওয়া লোক গুলোর মনে ভাবনার সৃষ্টি করে, পান কি এতো সুস্বাদু? প্রকৃতির সাথে কি না মানানসই।

পান খাওয়া প্রথম কবে থেকে শুরু হয়েছে তার সঠিক তথ্য জানা যায়নি। অনুমানের উপর ভিত্তি করে বলা হয় কৃষি ব্যবস্থা চালুর পর থেকে পান খাওয়া শুরু। ভেষজ ঔষধ হিসেবে বিভিন্ন গাছের পাতা খাওয়া হতো। পান ও তার ব্যাতিক্রম নয়।

পান পাতার আকার, কোমলতা, ঝাঁজ, ও সুগন্ধ ইত্যাদির জন্য বহু প্রজাতির পান রয়েছে। যেমনঃ- তামাক(তাম্বুক) যা তামাক ও মসলা বা জর্দা যুক্ত, সুপারি (সাদা)  পান, মিষ্টিপান ও সাচিঁপান প্রভৃত।  সিলেটিরা বেশির ভাগ মিষ্টিপান খেয়ে থাকেন যাকে সিলেটি ভাষায় খাসিয়া পান বলা হয়।

পানের বাগান কে বলা হয় বরজ। পানের বরজ সাধারণত উঁচু স্থান বা পুকুর পাড়ে ও দোঁআশ মাঠিতে লাগানো হয়। একটি পানের বরজ তৈরি করতে অনেক উপাদানের প্রয়োজন হয়। যেমনঃ- উপযুক্ত স্থান নির্বাচন, বাশঁ, সার, মোট অর্থ ও শ্রমিক। একটি পানের বরজ তৈরি করতে  ৭০ থেকে ৮০ হাজার অর্থের প্রয়োজন। শ্রমিকরা অনেক পরিশ্রম করেন পানের বরজে।  

পান এর সাথে সুপারি খাওয়া সাস্থের জন্য অনেক উপকারী বলে আমরা গুগলে খুজে পাই। কিন্তু ডাক্তারি পরামর্শ অনুযায়ী  জানা যায় যারা পান চিবোয় তাদের ক্যান্সারের ঝুকিতে থাকেন। ডাক্তাররা কখনো কোন রুগীকে পান খাওয়ার পরামর্শ দেননা। বরং পান খাওয়া ত্যাগ করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন।

যারা পান রসিক তারা পান ছাড়া থাকতেই পারে না। এটা তাদের একটা নেশায় পরিনত করে। আর এই নেশা ছাড়তে তাদের পক্ষে অনেক কষ্টসাধ্য হয়। পান রসিকরা যেকোন যায়গায় পান এর কস ফেলে যায়গা নোংরা করে, অনেক সময় কাপড়চোপড় ও নষ্ট করে ফেলেন।

পান নিয়ে  মধ্যযুগীয় কবি ও অনেক বর্ণনা করেন। কবি আলাওল তার পুঁথি সাহিত্যে পান নিয়ে বলেছেন “অধর রাতুল  কৈল তাম্বুল রশে”। পল্লি কবি জসিম উদ্দিন তার পালের নাও কবিতায় পান নিয়ে লিখেছেন “পালের নাও, পালের নাও, পান খাইয়া যাও, পালের নাও”। তিতাস একটি নদীর নাম উপন্যাসে মল্ল বর্মন লিখেছেন, “পান খাইও রসিক জামাই কথা কইয়ো তারে”।

এছাড়াও আরো অনেক কাব্যে পানের উল্লেখ্য রয়েছে। রয়েছে জনপ্রিয় গানও। আঞ্চলিক গানের মধ্যে চট্রগ্রাম এর শেফালী ঘুষের কন্ঠে “যদি সুন্দর একখান মুখ পাইতাম, মহেশখালীর পানের খিলি তারে খাওয়াইতাম”।

পান আমাদের সিলেটের বিয়ের কথা পাকা করতে যথেষ্ট ভুমিকা পালন করে। যে কোন বিয়ের অনুষ্ঠানে পান না হলেই নয়। অতিথি আপ্যায়ন করানোর পর দেওয়া হয় পান সাথে সুপারিও। সুপারি ছাড়া পান খাওয়াই যায় না। সুপারি এবং পান দুটোই সমান ভুমিকা পালন করে।

লেখকঃ আবিদা সুলতানা
আরও পড়ুনঃ
Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.