শাপলার রাজ্য জৈন্তাপুরের ডিবির হাওর

শাপলা হাসে খুব সকালে
সূর্য হাসার আগে
কাকডাকা সে ভোরবেলাতে
বিলটা ভাললাগে।

সিলেট শহর থেকে ৪২ কিলোমিটার দূরে জৈন্তাপুর উপজেলার দরবস্ত ইউনিয়নে শীতের পর থেকে অসংখ্য শাপলা ফুল ফুটে। পর্যটকরা এই জায়গাটিকে শাপলার রাজ্য বলে জানেন। শাপলার এই স্বর্গরাজ্যটি ডিবির হাওর নামেও পরিচিত। এই ডিবির হাওরের বিশেষত্ব হলো এখানে লাল শাপলা ফোটে।

ডিবির হাওরে শাপলা থাকে মোটামুটি তিন থেকে চার মাস। এই অপরূপ সৌন্দর্য্যের জায়গাটিকে উপভোগ করতে হলে নভেম্বর-জানুয়ারি মাসে যাওয়াই উত্তম। শীতের শেষে সম্পূর্ণ বর্ষাকাল জুড়ে বিলগুলো শাপলার রাজ্যে পরিণত হয়।

ডিবির হওর

বাংলাদেশের জাতীয় ফুল শাপলা। শাপলার অপার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়নি এমন কোনো লোক খুঁজে পাওয়া কষ্টকর। শুধুমাত্র বাংলাদেশেই নয়, শ্রীলংকারও জাতীয় ফুল এ শাপলা। শ্রীলংকায় শাপলাকে বলা হয় নীল-মাহানেল।

শাপলা বর্ষাকালে জন্মে ও ফুল ফোটে। শাপলা ফুল অগভীর আবদ্ধ জলাশয় আর খাল-বিলে জন্মে। বিশেষ করে বিলেই বেশি জন্মে। গ্রামাঞ্চলে বর্ষাকালে শাপলার দেখা পাওয়া যায়। বিলে, নদীতে ফুটন্ত শাপলা চাদরের মতো ফুটে থাকে। অনাবিল সৌন্দর্য নিয়ে অন্যের হৃদয়কে পুলকিত করে ফুলের রাজা শাপলা। বর্ষাকাল ছাড়া সারা বছর শাপলার দেখা পাওয়া যায় খুব কম।

সিলেটের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়নি এমন কাউকে পাওয়া যায় না। দুটি পাতা একটি কুঁড়ির দেশ সিলেট রূপসী বাংলার অপরুপ জেলা। এখানে চায়ের রাজ্য, শাপলার রাজ্য, এছাড়া এখানে রয়েছে নয়নাভিরাম জাফলং, রাতারগুল, বিছানাকান্দি, মালনীছাড়া চা বাগান সহ বহু পর্যটন স্থান। সেইসাথে ডিবির হাওর এক অনন্য মাত্রা যোগ করে দিয়েছে।

সিলেটের জৈন্তাপুরে রাজা রাম সিংহের স্মৃতিবিজড়িত ডিবির হাওর, ইয়াম, হরফকাটা কেন্দ্রী বিলসহ রয়েছে চারটি বিল। বিলগুলোকে কেন্দ্র করেই নাম করা হয়েছে ডিবির হাওর। প্রায় ৯শ একর জায়গা জুড়ে, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তবর্তী মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে এই চারটি বিলের অবস্থান ।

দিনের আলো বাড়ার সাথে সাথে শাপলার রূপ ম্লান হতে থাকে। ভোরের রক্তিম সূর্যের সৌন্দর্যও যেন হার মানে ভোরের ফুটন্ত শাপলার কাছে। তাই শাপলার প্রকৃত সৌন্দর্য উপভোগ করতে হলে ভোরে বের হতে হবে ।

ডিবির হাওরে শাপলা দেখার জন্য নৌকা নিয়ে বের হওয়া উত্তম। চারদিকে ফুটন্ত শাপলা দেখে আপনার ইচ্ছে হলে শাপলা ছুঁয়ে দেখতে পারেন, শাপলা তুলতে পারেন এবং ইচ্ছে হলে মাথায় শাপলার ফুল পরতে পারেন। এমনকি, প্রিয়জনকে ভালোবাসার প্রতিদানস্বরূপ উপহার ও দিতে পারেন।

বিলের পাশে মেঘালয়, পাহাড়ের নিচে খাসিয়া সম্প্রদায়ের বসবাস। হরফকাটা ও ডিবি বিলের মধ্যে রয়েছে রাজা রাম সিংহের সমাধিস্থল। দূর পাহাড়ে দেখা মিলবে খাসিয়াদের পান-সুপারির বাগান। প্রকৃতির বুকে শিল্পীর তুলিতে আঁকা এ যেন এক নকশিকাঁথা।

শাপলার রাজ্যে ২০০ বছরের ধ্বংসপ্রাপ্ত পুরনো মন্দির রয়েছে। জৈন্তাপুর গেলে এই মন্দির ঘুরে দেখতে পারেন। লোকমুখে শোনা যায় অনেক বছর আগে ডিবির হাওরের পানিতে ডুবিয়ে জৈন্তাপুর রাজ্যের কোন এক রাজাকে মারা হয়। অনেকে ধারণা করেন, সেই স্মৃতিকে অম্লান করে রাখার জন্য মন্দিরটি নির্মাণ করা হয়।

শাপলার রাজ্যে শাপলার রূপ দেখা ছাড়াও দেখতে পাবেন আশেপাশের জেলেদের জীবন, মাছ ধরা, শুঁটকি তৈরির পদ্ধতি, গ্রামীণ মানুষের জীবন-যাপন, ছোট ছোট শিশুর বিলে ঘোরাফেরা ইত্যাদি। গ্রামের ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা নৌকা বেয়ে দূরের হাওরে শাপলা তুলতে চলে যায়।

প্রাচীন রাজার স্মৃতিবিজড়িত এ হাওরে শীতকালে থাকে পাখিদের রাজত্ব। বিশাল হাওর শুকিয়ে যখন একাকার হয় তখন পাখিদের বিচরণ চোখে পড়ার মতো। বালিহাঁস, পাতিসরালি,পানকৌড়ি, সাদাবক ও জল ময়ুরীর মতো অতিথি পাখির ডানা ঝাপটায় অন্যরুপে সাঁজে এ হাওর। অতিথি পাখি দেখার লোভে বহু পর্যটক এখানে আসেন। আপনিও সময় করে চলে যেতে পারেন সিলেটের জৈন্তাপুরের ডিবির হাওরে।



বসন্তের শিমুল বাগান

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.