বসন্তের শিমুল বাগান

শিমুল বাগান (shimul bagan): “আহা আজি এ বসন্তে এত ফুল ফোটে, এত বাঁশি বাজে, এত পাখি গায়”। প্রকৃতিতে বসন্তের রঙ লাগুক আর নাই লাগুগ আজ সবাই মেতে উটবে বসন্তের উৎসবে। বসন্তের রঙ্গিন শুভেচ্ছা সবাইকে।

শীতকালের এখন যাবার সময়। মানুষের কাছে শীতকালের পরে বসন্ত হলো প্রিয় ঋতু। এ সময় চারদিকে নানা রঙ্গে প্রকৃতি রাঙ্গিয়ে উটে। বসন্ত মৌসুমে চারপাশ থাকে রঙ্গিন। রঙের টানে কিংবা নিজেকে রাঙ্গিয়ে নিতে পর্যটকরা চলে যান সুনামগঞ্জের শিমুল বাগানে।

সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুর উপজেলার উত্তর বড়বদল ইউনিয়নের মানিগাও গ্রামের এক কোনে বিশাল এই শিমুল বাগানের অবস্থান। একশ বিঘারও বেশী জায়গা জুরে জাদুকাটা নদীর তীরে এই শিমুল বাগানে রয়েছে তিনহাজারেরও বেশী শিমুল গাছ। পাশাপাশি আছে লেবুর গাছ। এমন অপরুপ সৌন্দর্যের দেখা পেতে হলে যেতে হবে সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে।

এমন সুন্দর জায়গা বাংলাদেশে আছে তা অনেকেই বিশ্বাস করতে চাইবে না। ছবিতে দেখে হয়তো মনে হবে এটি বিদেশের কোন জায়গা। কিন্তু না এমন সৌন্দর্যমন্ডিত জায়গা আমাদেরই দেশে অবস্থিত। এমন সুন্দর একটি শিমুল বাগান নিয়ে গর্ব করাই যায়। বিশাল এলাকা জুরে বিস্তৃত এই শিমুল বাগান। এত বড় শিমুল বাগান দেশের আর কোথাও নেই।

যিনি এই বাগান করেছিলেন তার পছন্দ আছে বলতেই হবে। তা না হলে এমন প্রত্যন্ত অঞ্চলে লাখ লাখ টাকা খরচ করে তিনি কেন এমন নান্দনিক বাগান করতে আগ্রহী হলেন। অনুসন্ধানী মন সলুকসন্ধান করতে চায়।  জানা যায় এমন সুন্দর এক শিমুল বাগান করেছিলেন সোহালা গ্রামের প্রয়াত হাজী জয়নাল আবেদিন।  যিনি বাদাঘাট ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ছিলেন। প্রায় ১৪ বছর আগে শিমুলের চারা রূপণ করেছিলেন তিনি। পৃথিবীর মায়া ছেড়ে অনেকে আগেই চলে গেছেন পরপারে। কিন্তু তার এই অমর কীর্তি শিমুল বাগান রয়েছে মাথা উচু করে।

হাজী জয়নাল আবেদিন একজন সত্যিকারের বৃক্ষ প্রেমি ছিলেন। তিনি এলাকায় স্কুল-কলেজ প্রতিষ্টার পাশাপাশি টাঙ্গুয়ার হাওড়ে লক্ষাধিক হিজল কড়চের গাছ লাগিয়েছিলেন। এলাকার বিভিন্ন গ্রামীণ রাস্তাগুলোকেও তিনি বৃক্ষে বৃক্ষে সবুজের তোড়ন করেছিলেন। সারি সারি বৃক্ষই তার স্মৃতির স্মারক হয়ে আছে।

এমনি করে কালের সাক্ষী হতে প্রকৃতির বুকে একটু অলংকার জুরে দিতে জয়নাল আবেদিন গড়ে তুলেছিলেন মেঘালয়ের পাদদেশে ও অপূর্ব যাদুকাটা নদী মধ্যস্থ বিস্তীর্ণ বালু বিশাল এলাকায় শিমুল বাগান। উত্তর বড়বদল ইউনিয়নের সুদৃশ্য বারাম নদীর তীর ঘেষেই মানিগাও গ্রাম। এ গ্রামে জয়নাল আবেদিনের নিজস্ব আড়াই হাজার শতক জমি একেবারেই অনাবাদি ছিল। পলির পরিবর্তে এখানে উজান থেকে ভেসে আসে বালি। এই ধু-ধু বালিতে কিভাবে সবুজের প্রলেপ একে দেওয়া যায় তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ এটি। ১৯৯৮ সালের কথা, একদিন শূন্য জায়গাটির পাশে পরিণত দুটি শিমুল গাছ দেখে তিনি শিমুল বাগান করার পরিকল্পনা করেন। ২০০২ সালে তিনি তার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেন।

বসন্তে এ শিমুল বাগানের ডালে ডালে ফোটে রক্ত রাঙা শিমুল। ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি থেকে শুরু করে মার্চ মাসের প্রায় শেষ পর্যন্ত এ বাগান ফুলে ভরপুর থাকে। ফুল আছে কিন্তু পাখি থাকবে না এ কি করে হয়। শিমুল বাগান এর ফুল খেতে পাখিরা তাই ভির জমায় এখানে। এ দৃশ্য সত্যিই অনেক সুন্দর। ৩০ একরেরও বেশী বাগানটি যেমন বর্গাকার তেমনি গাছগুলোকেও লাগানো হয়েছে বর্গাকার ভাবে। এই স্কয়ার আকৃতির বাগানটির বিশেষত্ব হলো আপনি ডানে-বায়ে সামনে-পিছনে এমনকি কোণাকোণি যেভাবেই থাকাবেন সমান্তরাল গাছের সারি দেখতে পাবেন।

শিমুল বাগানের কাছেই আছে সুদৃশ্য বারেক টিলা। এই টিলায় বসে জাদুকাটা নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। আবার টিলার উপর আছে কুরচি ফুলের বন। একসঙ্গে এত কুরচি ফুল খুব একটা দেখা যায় না। শিমুল বাগান থেকে হেটে বারেক টিলায় যাওয়া যায়। সময় লাগতে পারে আধা ঘন্টার মত।

বসন্ত আসলেই প্রকৃতিপ্রেমিদের মনে এক নতুন ভাললাগার সৃষ্টি হয়। আর এই ভাললাগাটাকে দ্বিগুন করে দেয় সুনামগঞ্জের শিমুল বাগান। মনের তৃষ্ণা মিটিয়ে এখানে বসন্তের সব সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। বসন্তকালে শিমুল বাগানের দিকে থাকালে গাছের ডালে ডালে লেগে থাকা লাল আগুনের ঝলকানি চোখে এসে লাগে। শিমুল ফুলের রক্ত লাল পাপড়িগুলোর সৌন্দর্য এখানে আসা সকল মানেষের মনকেই রাঙিয়ে দেয়। একদিকে মেঘালয় পাহাড় সারির অক্রৃত্তিম সৌন্দর্য অন্যদিকে রূপবতী যাদুকাটা নদীর তীরের শিমুল বাগানের তিন হাজার গাছের লাল ফুলের সমাহার শরীরে ভাল লাগার শিহরণ ধরিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

ফেব্রুয়ারি-মার্চ এই দুই মাসই শিমুল বাগান ভ্রমনের উপযুক্ত সময়। জুলাই-সেপ্টেম্ভর মাসে এই বাগান সবুজ পাতায় ছেয়ে থাকে। তখন ভ্রমনের ভিন্ন স্বাদ পাওয়া যাবে। ফুলের স্থায়িত্ব মাত্র এক মাস! বসন্তের শুরুতে ফুল ফোটে তারপর ঝরে যায় বেশ দ্রুত। অর্থাৎ কেবল ফাগুন মাসেই আগুন ঝরে শিমুলের ডালে।

শুধু বসন্তেই নয়, বছরের সবদিনই দেশ-বিদেশ থেকে পর্যটকরা এখানে বেড়াতে আসে এবং বাগানের সৌন্দর্য উপভোগ করে তৃপ্তি নিয়ে ফিরে যান।

 

 

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.