প্রকৃতির এক বিস্ময় হাম হাম

হাম হাম জলপ্রপাতঃ সুজলা-সুফলা শস্য শ্যামল আমাদের এই দেশ বাংলাদেশ। প্রাকৃতিক লীলাভুমির অপরূপ সব নিদর্শন বাংলাদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। পাহাড়-পর্বত, বন-জঙ্গল, বিভিন্ন প্রাকৃতিক সম্পদে পরিপূর্ণতা লাভ করছে আমাদের দেশে। সৃষ্টিকর্তার যেন এক অমূল্য দান। কিন্তু আমাদের অনেকেই বাংলাদেশের এই অপরূপ সৌন্দর্য সম্পর্কে খুবই কম ধারণা রাখি। অথবা আমরা এ সম্পর্কে উদাসীন। অথচ আমরা বাইরের সৌন্দর্য দেখে আশ্চারজান্যিত হই। কবির ভাষায় বলা যায়,

“বহু দিন ধরে, বহু ক্রোশ দূরে। বহু ব্যয় করি, বহু দেশ ঘুরে। দেখিতে গিয়াছি পর্বতমালা, দেখিতে গিয়াছি সিন্ধু। দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া, ঘর হতে শুধু দু পা ফেলিয়া, একটি ধানের শীষের উপরে, একটি শিশির বিন্দু।”

কবি যথার্থই বলেছেন, আমরা আমাদের নিজেদের বাড়ির সামনের সৌন্দর্যই খেয়াল করি না। আমাদের সরকারও কিছুটা এতে দ্বায় আছে, অবশ্য বর্তমানে সরকারি ভাবে দু-একটি ওয়েবপেজ খোলা হয়েছে ভ্রমন সংক্রান্ত বিষয়াদি নিয়ে।

আজ আমরা কথা বলব বাংলাদেশের অপরূপ সৌন্দর্যের অন্যতম একটি স্থান সিলেট বিভাগের মৌলভিবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার রাজকান্দি বনাঞ্চলের গভীরে কুরমা বন বিট এলাকায় অবস্থিত প্রাকৃতিক জলপ্রপাত “হামহাম” নিয়ে।

অবস্থানঃ
হামহাম জলপ্রপাত এর অবস্থান সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলায়।  রাজকান্দি বনাঞ্চলের গভীরে কুরমা বন বিট এলাকায় এর অবস্থান।

হাম হাম

নামের সূচনাঃ
হাম হাম নামটি বাংলাদেশের অন্যান্য জেলায় অপরিচিত হলেও সিলেটি মানুষের কাছে এটি একটি পরিচিত নাম। হাম হাম নামটি অপরিচিত থাকার কারন হলো এটি পরিচিতি পাওয়ার খুব বেশী দিন হয়নি এবং এটির সম্পর্কে পরিষ্কার কোন ধারনা এখনও মানুষের কাছে পৌছায়নি।

সাধারণ পর্যটকরা এর নাম সম্পর্কে বিভিন্ন ধারনা দিয়ে থাকেন। কেউ কেউ ঝর্নার সাথে গোসলের (হাম্মাম=হাম হাম) সম্পর্ক আছে বলে মনে করেন। কেউবা বলেন সিলেটি ভাষায় আ-ম-আ-ম মানে, পানির তীব্র শব্দ এর থেকে হাম হাম নামের উৎপত্তি হয়েছে। তবে স্থানীয়দের কাছে এই জলপ্রপাত ‘চিতা ঝর্না’ হিসেবে পরিচিত। কারন একসময় এ জঙ্গলে নাকি চিতা বাঘ পাওয়া যেত।

বিস্তারিতঃ
হাম হাম জলপ্রপাত বাংলাদেশের এক বিস্ময়কর প্রাকৃতিক জলপ্রপাত। বর্ষাকাল হলো ঝর্নার প্রকৃত সময়। বর্ষাকালকে ঝর্নার যৌবনও বলা হয়। কারন এ সময় ঝর্নার আসল সৌন্দর্য প্রকাশ পায়।

বর্ষাকালে পানি প্রচন্ড বেগে প্রবাহিত হওয়ার কারনে ঝর্না তার সবটুকু রুপ বাহির করে দেয়। এ সময় যে কেউ ঝর্নার প্রেমে পড়তে বাধ্য। ঝর্নার থেকে আসা পানি বনের ভিতর দিয়ে ছোট ছোট খালে বিভক্ত হয়ে বয়ে যায় তার আপন গতিতে। এরকম ছোটবড় খাল পেড়িয়ে জঙ্গলের ভিতর দিয়ে আসতে হয় ঝর্নার কাছে।

এ পথ কিন্তু এতটা সহজ নয়। অনেক লম্বা বন-জঙ্গল পেরিয়ে তার পরে ঝর্নার কাছে যেতে হয়। অবশ্য ভ্রমনপিপাসুদের কাছে এ পথ অনেক এডভেঞ্ছারময় হবে। হামহাম জলপ্রপাত আড়ালে তার রুপের জাদু লুকিয়ে রেখেছিল অনেকদিন।

কিন্তু যখনই এটি আবিষ্কৃত হলো তখন থেকে এর সৌন্দর্য সারা দেশে বিকশিত হতে সময় লাগেনি। হামহাম জলপ্রপাত কারও চোখে পরতে বেশ দেরী হওয়ার অন্যতম একটি কারন হলো দুর্গম পথ। কারন হামহামের কাছে যাওয়ার পথটা অত্যন্ত দুর্গম। বিশেষ করে পরিবারের ছোট-বড় একসাথে সবাইকে নিয়ে যাওয়টা সেখানে ঝুঁকির বিষয় বটে।

তাই এ জলপ্রপাত সবাই দেখার আফসোস থেকেই যায়। কিন্তু সরকার বা কেউ ব্যাক্তিগত উদ্দোগে সেখানে পৌঁছার রাস্তা সহজ করতে পারে তাহলে এটি সবার জন্য উন্মুক্ত এবং সারা দেশে অসাধারন জনপ্রিয়তা লাভ করবে। সচ্ছ পানির নিদারুন শব্দে ভরা পাহড়ি পাথরের গায়ে আছড়ে পড়ার এই দৃশ্য অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর ।

প্রায় দেড়শ ফুট উঁচু থেকে পানি নানান রকমের ফুল লতা পাতা বেয়ে সমতলে এসে পড়ে। বাঁশবন, ঝাড়বন, লতাগুল্ম বেয়ে পানি পড়ার দৃশ্য সত্যিই এক বিস্ময়। 

হাম হাম জলপ্রপাত কে কখন প্রথম আবিষ্কার করেছে তা বলা মুশকিল। ২০১০ সালে একদল পর্যটক এই জলপ্রপাত এর সন্ধান পাওয়ার দাবি করেন।

তবে স্থানীয়রা বলেন তারা এই জলপ্রপাতের কথা অনেক আগে থেকেই জানতেন। এর সঠিক উচ্চতা এখনও পরিষ্কার না। তবে ধারনা করা হয় এর উচ্চতা ১৩৫-১৬০ ফুটের মধ্যে। যেখানে বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু ঝর্না মাধবকুন্ড এর উচ্চতা ১৬২ ফুট। তবে উচ্চতার দিক দিয়ে না হোক প্রস্থের দিক থেক এটি মাধবকুন্ড জলপ্রপাত এর থেকে অনেক বড়। 
হাম হাম জলপ্রপাতে যাওয়ার জন্য প্রথমে যেতে হবে কলাবন পাড়া থেকে যেটা কমলগঞ্জ উপজেলার শেষ গ্রাম। এর পরেই বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত। কলাবন পাড়া পর্যন্ত গাড়ি যাবে, এর পরে আর গাড়ি নিয়ে যাওয়া যাবে না।

পায়ে হেঁটে বাকি পথ পাড়ি দিতে হবে। হাম হাম জলপ্রপাত এ পৌঁছাতে হলে গহীন বনে প্রায় আড়াই ঘন্টা হাটতে হবে এবং বনের প্রায় ৭-৮ কিলোমিটার ভিতরে হাম হাম অবস্থিত। এই গ্রামে অনেকেই গাইড হিসেবে কাজ করে, তাই চাইলেই কাউকে নেওয়া যাবে গাইড হিসেবে। এতে করে পথ হারানোর ভয় থাকবে না।

পাহাড়ি রাস্তায় যাতায়াত করতে হয় বলে সাথে একটি লাঠি জাতীয় কিছু রাখলে ভাল হয়। যেহেতু বেশীরভাগ পর্যটক বর্ষাকালে এখানে আসে তাই এ সময় একটু সতর্কতার সাথে পাহাড়ি উঁচু নিচু পথ পারি দিতে হয়।

এখানে কুরমা বনবিটের চাম্পারায় নামক চা বাগান দিয়ে যেতে হয়। বনে ঢুকতে দুটি রাস্তা পাওয়া যাবে। একটা ডানে আর একটা বামে। ডান দিকের রাস্তায় যাওয়া উত্তম। পথে যেতে যেতে বিভিন্ন ধরনের গাছ-গাছালি, নানা প্রজাতির বাঁশ, কলাগাছ ইত্যাদি চোখে পড়বে।রাস্তায় ছোট-বড় আঁকা-বাঁকা অনেক টিলা পাওয়া যাবে। তবে সবচেয়ে উঁচু যে টিলা পাওয়া যাবে সেটির নাম হচ্ছে মোকাম টিলা। মোকাম টিলার পাশেই ছোট আর একটি ঝর্না আছে যেটি ‘সিতাব’ নামে পরিচিত। আরও কিছুক্ষন হাঁটার পরেই ঝর্নার মধুর শব্দ কানে আসবে। যা পথের সব ক্লান্তি ভুলিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

পরিশেষেঃ

হাম হাম জলপ্রপাত দেশের এক অন্যতম আকর্ষনীয় পর্যটন স্থান হয়ে উঠবে যদি এখানে সরকারি ভাবে সঠিক দিক নির্দেশনার মাধ্যমে রাস্তা-ঘাট ও পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়। এতে দেশের অর্থনীতিতেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করতে পারবে এবং দেশ-বিদেশের পর্যটকদের কাছে এটি খুব সহজেই মন জয় করে নিতে পারবে।

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.