নীলাদ্রি খ্যাত শহীদ সিরাজী লেকের আদ্যপান্ত

বর্ষাকালে শহীদ সিরাজী লেক

কেউ বলে বাংলার কাশ্মির, কেউ বলেন লাইমস্টোন, আবার কেউ বা বলেন নীলাদ্রি। স্বর্গীয় সৌন্দর্যে ভরা জায়গাটা কাশ্মীর নয় আমাদের দেশেই ,বলছি সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার টেকেরঘাট মেঘালয় সীমান্তবর্তী শহীদ সিরাজী লেকের কথা।

এখানে আসা পর্যটকরা এ লেকটিকে বিভিন্ন নাম উপস্থাপন করতে দেখে সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসন মতামতের ভিত্তিত্বে এই লেকটির নাম করণ করেছেন শহীদ সিরাজী লেক। অসংখ্য ছোট, বড় টিলা নদী, পরিবেষ্টিত প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে ভরপুর এক আকর্ষনীয় স্থানের নাম শহীদ সিরাজী লেক।  যান্ত্রিক কোলাহল থেকে মুক্ত নির্জন স্থান পেতে এই লেকের বিকল্প নেই। লেকের রুপ লাবণ্য পর্যটকরা যত দেখবেন ততই মন ও হৃদয়কে আকর্ষনীয় করে তুলতে পারবেন।

নামকরনঃ

নীলাদ্রি লেকের অবস্থান ভারতের মেঘালয় সীমান্তবর্তী উপজেলার উত্তর শ্রীপুর ইউনিয়নের ট্যাকেরঘাটে।  মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার ৫ নম্বর সেক্টরের ৫ নম্বর সাব সেক্টর ছিল টেকেরঘাট।  মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম ছিলেন এই সাবসেক্টর টেকেরঘাটের কমান্ডার।  সম্মুখ যুদ্ধে শহীদ হলে তাঁকে কবর দেওয়া হয় এই টেকেরঘাটে।  তাই এককালের চুনাপাথরের খনি যখন লেকে পরিণত হয়, তখন এর নামকরণ করা হয় শহীদ সিরাজ লেক।  মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখার জন্য এই কমান্ডারকে বীর বিক্রম উপাধীতে ভূষিত করা হয়েছিল।  এই লেকের পাড়েই আছে শহীদ সিরাজের সমাধি।

প্রতিদিন শত শত পর্যটক ভিড় করেন এ লেকের সৌন্দর্য উপভোগ করতে।  একদিকে টাঙ্গুয়ার হাওর আর অন্যদিকে মেঘালয়ের অপরূপ সৌন্দর্য এ লেককে করেছে অপরূপা।  নীল আর সবুজের হাতছানিতে এ লেক রূপ নিয়েছে অনন্যারূপে।  চোখে না দেখলে বিশ্বাসই করতে পারবেন না কেউ যে প্রকৃতির এক অনন্যা রুপে রূপায়িত এই লেকের পানির রঙ এতটাই  নীল যে সেন্টমারটিন এর পানির সাতে তুলনা করা হয় যার ফলে লোকজন একে নীলাদ্রি লেক বলেই ডাকা শুরু করেন। সত্যি কথা বলতে গেলে স্থানীয়রা নামটা যেমন সুন্দর রেখেছেন আসলেই এর রূপটাও তেমন মোহনীয় ।  

পিছনের গল্পঃ  

পশ্চিম দিক থেকে তোলা

জানা যায়, শুধু পর্যটকরাই এ লেকটিকে নীলাদ্রি নামে চেনেন,  স্থানীয়রা পাথর কোয়ারিই বলে। দেশের একমাত্র চুনাপাথর খনিজ প্রকল্পটি ১৯৬৬ সালে ট্যাকেরঘাটে স্থাপিত হয়।  বিসিআইসি চুনাপাথর খনি প্রকল্পের পাথর কোয়ারিকে এক সময় সবাই চিনত ‘নীলাদ্রি লেক’ নামে।  

১৯৪০ সালে সুনামগঞ্জের ছাতকে নির্মাণ করা হয় আসাম বাংলা সিমেন্ট ফ্যাক্টরি।  ভারতের মেঘালয় পাহাড় থেকে চুনাপাথর সংগ্রহ করে এর চাহিদা মেটানো হতো।  ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর বিভিন্ন সমস্যা ও ব্যয় বৃদ্ধির কারণে ভারত থেকে চুনাপাথর সংগ্রহ বন্ধ হয়ে পড়লে সিমেন্ট ফ্যাক্টরিটি চালু রাখতে তাহিরপুর সীমান্তের টেকেরঘাটে এলাকার ৩২৭ একর ভূমির উপর জরিপ চালিয়ে ১৯৬০ সালে চুনাপাথরের সন্ধান পায় বিসিআইসি কর্তৃপক্ষ।  সন্ধানের পর ১৯৬৬ সালে থেকে খনিজ প্রকল্প চালু করে মাইনিংয়ের মাধ্যমে দীর্ঘদিন পাথর উত্তোলন করা হয় এই লেক থেকে।  পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালে প্রকল্পটি লোকসানি প্রতিষ্ঠান দেখিয়ে কোয়ারি থেকে পাথর উত্তোলন বন্ধ করে দেয় কর্তৃপক্ষ।

পরিকল্পনাঃ  

সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসন সুত্রে জানা যায়,  এই জায়গাটিকে পর্যটক বান্ধব করে গড়ে তুলতে লেকের আশপাশে পর্যটকদের জন্য প্রচুর টাকা ব্যায়ে এখানে নৌকা ঘাট, গণশৌচাগার, ৫টি ছাতা, সীমানা প্রাচীর, বসার বেঞ্চ, গোলঘর নির্মাণ, রাত্রি যাপন ও থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।  আগত পর্যটকদের সার্বিক নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে শহীদ সিরাজী লেক ও টাঙ্গুয়া হাওরে দিনরাত পুলিশি নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।

সাবধানতা ও পরামর্শঃ

এখান থেকে খুব বেশি পরিমাণে চুনা পাথর উঠানো হতো, যার ফলে লেকটি বেশ গভীর।  লেকের পানিতে সাঁতার না জানলে না নামাই ভালো। নামলেও বেশি দূরে যাবেন না।  যেহেতু সীমান্ত এলাকা তাই সাবধানে থাকুন।  সীমানার খুব কাছাকাছি না যাওয়াই ভালো ।  তবে লেকের সৌন্দর্যে দিশাহারা হয়ে এর গভীরে চলে গেলে ফিরে আসার সম্ভাবনা কম।  কারণ এখানে উত্তোলিত পাথরের গর্তে এখন গভীর লেক, গড় গভীরতা ১০৫ ফিটেরও অধিক। স্বচ্ছ ও নীল পানি দেখেই লাফ দেবেন না।  আগে নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়ে নিন।  এ পর্যন্ত এই লেকের পানির সৌন্দর্যে অনেকেই পানিতে নেমে পড়েন, প্রতিবছরই এই লেকে সাঁতার কাটতে গিয়ে কেউ না কেউ না ফেরার দেশে চলে যাচ্ছেন বলে খবর পাওয়া যায়।  

যোগাযোগ ব্যবস্থাঃ

তাহিরপুর সীমান্তে দৃষ্টিনন্দন এ পাথর কোয়ারির অবস্থান হলেও যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো না হওয়ায় পর্যটকদের কাছে অধরাই ছিল এর সৌন্দর্য। দিন দিন ভ্রমণ পিপাসুদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে শহীদ সিরাজী লেকটি।

ঢাকা থেকে সিলেটের বাসে করে রাতে রওনা দিয়ে ভোরে সুনামগঞ্জ পৌঁছাবেন, তারপর সাহেব বাড়ি ঘাট, নৌকায় করে মনিপুরি ঘাট সেখান থেকে তাহেরপুর অথবা সরাসরি ট্যাকেরঘাট চুনাপাথর খনি প্রকল্প, তাহিরপুর, বাজার।  

ঢাকা থেকে শ্যামলী/মামুন/এনা এবং আরও কিছু বাস যায় সুনামগঞ্জে, যে কোনো একটাতে উঠে পড়ুন,  ভাড়া পড়বে জনপ্রতি ৫৫০ টাকা । সুনামগঞ্জ থেকে নতুন ব্রীজ পার হয়ে মোটর সাইকেল নিয়ে যেতে হবে।  প্রয়োজনে টেকেরঘাট পর্যন্ত সরাসরি মোটর সাইকেল রিজার্ভ নিতে পারেন।  সেক্ষেত্রে ভাড়া ৩০০-৫০০ টাকা হতে পারে আর মাঝপথে যাদুকাটা নদী পার হতে জনপ্রতি ভাড়া ৫ টাকা আর মোটর সাইকেল এর ভাড়া ২০ টাকা করে নিতে পারে ।

কোথায় থাকা যায়ঃ  
হাতেগুনা কয়েকটা রেস্ট হাউজ এবং গেস্ট হাউজ আছে  বড়ছড়া বাজারে ।  সেখানে আপনি ২০০-৪০০ টাকায় রাত কাঁটাতে পারেন।  বারিক্কা টিলা পাড় হয়েই বড়ছড়া বাজারটা চোখে পড়বে ।  ইচ্ছে হলে টেকেরঘাট থেকে হেঁটেও আসতে পারেন বড়ছড়া বাজারে।  এছাড়াও লেকের পাশে বন্ধ হয়ে যাওয়া একটি চুনা পাথরের কারখানা আছে।  কারখানাটির গেস্ট হাউজে থাকতে পারেন যদি খালি থাকে।

পরিশেষেঃ

অনেকেই সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর দেখতে যান।  কিন্তু  এর আশেপাশেই অনেক সুন্দর সুন্দর নয়নাভিরাম জায়গা আছে যা যে কোনো পর্যটকের মনকে মুহূর্তেই দোলা দিয়ে যেতে পারে ! বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং প্রানবন্ত অনুষ্ঠান  ইত্যাদি গত বছরে এই লেকে অনুষ্ঠিত হয়েছে।  সত্যিই যায়গাটা দেখলে প্রানটা জুড়িয়ে যায়।  এই লেক ঈদের মৌসুমে পর্যটকদের মিলন মেলায় পরিনিত হয়।  এর অপরূপ সৌন্দর্যে ডুব দিতে নিশ্চিন্ত মনে ঘুরে আসুন সুনামগঞ্জ থেকে। 

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.