অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে হাওর জিতবে কি ?

হাওরের বাস্তুসংস্থান, প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও সৌন্দর্য রক্ষার প্রতিকুলে বয়ে চলছি আমরা। যেন হাওরকে ধ্বংসের সকল আয়োজন করতে হাওরবাসী থেকে কর্তাব্যক্তি সকলেই ব্যতিব্যস্ত। ধ্বংসের মুখে পতিত এই হাওরের ভূত ভবিষ্যৎ নিয়ে লিখছেন ইঞ্জিনিয়ার উজ্জ্বল তালুকদার।

বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিমের একটি গানের লাইনে বলা আছে “আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম” এই গান আমরা কম বেশি সবাই জানি। এই গান মনযোগ দিয়ে শুনলে হাওর পাড়ের মানুষের অতীতের অনেক আনন্দ,বেদনা,উৎসব, কৃষ্ঠি সংস্কৃতি স্বমন্ধে জানা যায় ও বোঝা হয়। আরেকটি লাইনে আছে “বর্ষা যখন হইত গাজীর গান আইত রংয়ে রংয়ে গাইত আনন্দ পাইতাম।” বর্তমান সময়ে উনি বেঁচে থাকলে আমরা হাওর এলাকা নিয়ে আরও অনেক নতুন গান শুনতে পারতাম।

বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ। হাওর এলাকা মিঠা পানির জন্য প্রসিদ্ধ। তাই হাওরে বোরো আবাদ ও দেশ মাছ দুটোই ভাল্ভাবে পাওয়ার সহজ উপায়। তাই হাওর এলাকা একসময় ধান ও মাছের জন্য প্রসিদ্ধ ছিল। ৩০-৪০ বছর আগে হাওর এলাকায় যারা বাস করত তাদের মৌলিক চাহিদাগুলি মেটানো খুব সহজ ছিল। ভাত,মাছ, গরুর দুধ খুব সহজ প্রাপ্য ছিল।

“আমরা মাছে ভাতে বাঙ্গালী এই প্রবাদটি যেন হাওর পাড়ের মানুষের একেবারে মনের কথা। গোলাভরা ধান, গোয়াল ভরা গরু হাওর ভরা মাছ এইগুলি ছিল হাওর পাড়ের মানুষের জীবন ধারণের জন্য মূল্যবান জিনিস। ৮ মাস শুকনো থাকত হাওর, চার মাস হাওর ভরা পানি। পানি থাকা অবস্থায় মানুষের তেমন একটা কাজ কাম থাকত না তাই একসাথে সবাই মিলে আড্ডা দেওয়া, নৌকা বাইচ, গাজীর গান এই সব নিয়েই দিন কাটত মাঝে মধ্যে রাতে বসত গানের আসর। বর্ষাকালে সবাই সবার আত্নীয় স্বজনের বাড়িতে যেত। সবার জীবন যাপন ছিল একেবারে সহজ সরলতায় ভরপুর।

অতিথি পরায়নতার কোন কমতি ছিল না হাওর পাড়ের মানুষের মাঝে। বৈশাখ মাসে হাওর পাড়ে একটা উৎসব ভাব বিরাজ করত। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে বড় বড় নৌকা নিয়ে ধান কাটার লোকজন আসত। এদেরকে বেফারী বলে সম্বোধন করা হত। বৈশাখ মাসে সন্ধ্যার সময় সবাই একসাথে বসে আড্ডা দেওয়া গরম গরম জিলাপি খাওয়া, খলাতে খলাঘ্র থাকত (ধান শুকানোর জায়গার মান খলাঘর)। রাতে এখানে ঘুমানোর ব্যবস্থা থাকত। সারাদিন অনেক পরিশ্রম করার পর ও রাতের বেলা ঐ কষ্টটা কার মনে থাকত না। জৈষ্ঠ্য মাসে সবাই ধান শুকানোর খড় বাড়ী নিয়ে আসত।

যুগের অত্যাধুনিকতার সাথে সাথে অনেক কিছুই ইতিহাস হয়ে যায়। কৃষক আঁউস এবং আমন ধান কেটে এনে বাড়ী উঠানে (আংগিনায়) এভাবে গরু দিয়ে মাড়াই করে ধানগাছ থেকে ধান ছাটাই করতো, আর এইকাজে সহযোগিতা করতো কৃষাণীরা ও পরিবারের ছোট বড় সবাই, সবার মাঝে ছিলো আনন্দ আর উদ্দিপনা । যা আজ অতীত হয়ে গেছে ।

একেকজন কৃষক একদিন একদিন পর বা একসাথে খড়ের লাচ্চি ( খড় একসাথে গাদাগাদি করে রাখা) দিত। লাচি উপলক্ষে কেউ খাসি কেউবা মুরগি/হাঁস ইত্যাদি দিয়ে দাওয়াত করে পাড়া প্রতিবেশীকে খাওয়াত। এই পথাগুলি একসময় হাওড়পাড়ের মানুষের ঐতিহ্য ছিল ।

একসময়ে দেশের মানুষের বাহনগুলির মাঝে গরুর গাড়ীও বাহন হিসাবে ছিলো অন্যতম , যা এখন যুগের তালে তালে ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নিয়েছে ।

সময়ের সাথে সাথে আস্তে আস্তে করে এগুলি হারিয়ে যাওয়ার পথে। এখন পাওরপাড়ের আর বড় …নেই। গোয়াল ভরা গরুও নেই, গোলা ভরা ধান ও নেই। বর্তমান সময়ের ছেলে মেয়েদের কাছে এগুলি রূপকথার গল্পের মত মনে হবে। জনসংখ্যা বাড়ার সাথে মানুষের নতুন ঘরবাড়ি প্রয়োজন হচ্ছে সেই সাথে জবালানি,খাদ্য এই সবের চাহিদা ও বাড়া শুরু হল। মানুষ ধীরে ধীরে মাঠে, কৃষি জমিতে ঘর বাড়ি বানানো শুরু হল। জ্বালানির প্রয়োজনে গাছ কাটা শুরু করল , জীবিকা নির্বাহের জন্য অবাধে মাছ ধরা, পাখি শিকার শুর করল। যা এখন পর্যন্ত চলমান। এখন বর্ষার শুরুতে যখন মা মাছ গুলি ডিম পাড়া শুরু করে তখন কোনাজালের মাধ্যমে(মশরির মত বিশাল্বড় জাল) পোনা ধরা হচ্ছে। অধিক ফলনের জন্য সার, কীটনাশক ব্যবহার করা হচ্ছে। অবৈধ পাখি শিকারিদের পাখি মারার কারনে এখন আর অতিথি পাখিও আসে না। হাওরের মধ্যে কিছু দেশি পাখি আগে যাছিল এখন সে গুলি ও বিলুপ্তির পথে।

প্রকৃতিক জিনিসগুলি যখন ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে ঠিক তখনই হাওর অঞ্চলে খরা, অতিবৃষ্টি, অকালবন্যা, শিলাবৃষ্টি এখন এই প্রাকৃতিক দূর্যোগ গুলি নিয়মিত হচ্ছে। শাহ আব্দুল করিমের হানের কথা ধরে বলতে হয় দিন হতে দিন আসে যে কঠিনে করিম প্রীণহীন কোন পথে যাইতাম। সত্যিকার অর্থেই হাওর পাড়ের মানুষ এখন কোন পথে যাবে।

ইঞ্জিনিয়ার উজ্জ্বল তালুকদার।

নীলাদ্রি খ্যাত শহীদ সিরাজী লেকের আদ্যপান্ত

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.