বীর বিক্রম জগৎজ্যোতি দাসের ৪৮তম শাহাদতবার্ষিকী

মুক্তিযুদ্ধের গেরিলা বাহিনী দাসপার্টির কমান্ডার ও সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের যুদ্ধকালীন সময়ের ছাত্র জগৎজ্যোতি দাসের ৪৬তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ।

জগৎজ্যোতি দাসের জন্ম ১৯৪৯ সালের ২৬ এপ্রিল হবিগঞ্জ জেলার আজমিরীগঞ্জ উপজেলার জলসুখা গ্রামে। তার পিতার নাম  জীতেন্দ্র দাস। ১৯৬৮ সালে ম্যাট্রিক পাস করার পর সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজে ভর্তি হয়ে ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দেন।

পরে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে অংশ নিতে কৌশলগত কারনে ভারতে চলে যান এবং সেখানে গোহাটির নওপং কলেজে ভর্তি হন। ভারত থেকে অস্ত্র গোলাবারুদ সম্পর্কে ধারণা নিয়ে আবার বাংলাদেশে ফিরে আসেন জগৎজ্যোতি।

১৯৭১ সালের  মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করার সিদ্ধান্ত নেন। এরপর ভারতের মেঘালয় রাজ্যের ইকো-১ ট্রেনিং ক্যাম্পে যোগ দেন।

মুক্তিযুদ্ধের ৫ নং সেক্টর বাংলাদেশের ভাটি অঞ্চলগুলো নিয়ে গঠিত হয়। এই অঞ্চলগুলি হচ্ছে, সুনামগঞ্জ-হবিগঞ্জ-কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনার হাওরাঞ্চল। তৎকালীন মেজর শওকত আলী ৫ নং সেক্টরের কমান্ডারের দায়্ত্বি পান ।

এ সেক্টরকে কয়েকটি সাব-সেক্টরে বিভক্ত করা হয়। টেকেরঘাট সাব-সেক্টরের দায়িত্ব ছিল সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের কাছে। সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের অধীনে জগৎজ্যোতি প্রথমে বিভিন্ন আক্রমণে অংশগ্রহণ করেন। 

এরপর তার নেতৃত্বে প্রশিক্ষিত যোদ্ধাদের নিয়ে গঠিত হয় গেরিলা দল, যার নাম দেওয়া হয় ফায়ারিং স্কোয়াড দাস পার্টি। এখান থেকেই দাস পার্টির উৎপত্তি। দাস পার্টি কয়েকটি সফল অপারেশন সম্পন্ন করে।

এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অপারেশন ছিল পাকবাহিনীর বার্জ আক্রমণ ও বদলপুর অপারেশন।

বার্জ আক্রমণঃ ১৯৭১ সালের ১৬ অক্টোবর দাস পার্টি পাকবাহিনীর বার্জে আক্রমন করে বার্জটিকে ধ্বংস করে দেয়। পরবর্তীতে বানিয়াচংয়ে কার্গো বিধ্বস্ত করা, বানিয়াচং থানা অপারেশন, পাহাড়পুর অপারেশনসহ বেশ কয়টি ছোট বড় অপারেশন দাস পার্টির যোদ্ধারা সফল ভাবে সম্পন্ন করে। তবে দাস পার্টির সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল পাকবাহিনীর বার্জ আক্রমন।

বদলপুর অপারেশনঃ বদলপুর অপারেশন ছিল মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম  বড় একটি অপারেশন। দাস পার্টি আজিমিরীগঞ্জ, মারকুলি, গুঙ্গিয়ারগাঁও প্রভৃতি অঞ্চলে শত্রু ঘাঁটি ধ্বংস করে দেয়। জগৎজ্যোতি দাস পার্টির ৪২ জন সদস্য নিয়ে নৌকাযোগে রওয়ানা দেন। কিন্তু বদলপুর নামক স্থানে পাকবাহিনীর পাতাফাদে পরে যায় দাস পার্টি। শুরু হয় তুমুল যুদ্ধ।

পাক বাহিনীর তুলনায় দাস পার্টির অস্ত্র গোলাবারুদ অত্যন্ত নগন্য ছিল। তাই অপারেশনের মাঝেই তাদের গোলাবারুদ কমে আসতে থাকে। কিন্তু জগৎজ্যোতি ক্ষান্ত হননি। প্রাণপণে তার সাথীরা যুদ্ধ চালিয়ে যান। একসময় তার সাথীদের বাচাতে স্থান ত্যাগ করতে বলেন তিনি। এজন্য জ্যোতি তার সহযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী মমিনকে নির্দেশ দেন যাতে অন্যরা তাদের জীবন বাঁচিয়ে নিরাপদ স্থানে সরে যায়।

তবে তার সহযোদ্ধা ইলিয়াসকে সাথে নিয়ে যুদ্ধ অব্যাহত রাখেন তিনি। ইলিয়াস গুলিবদ্ধ হন। গুলিবদ্ধ ইলিয়াসকে জগৎজ্যোতি জিজ্ঞেস করেন বাঁচবি? ইলিয়াস হ্যাঁ বললে জগৎজ্যোতি বলেন, তাহলে যুদ্ধ কর। তার মাথার গামছা খুলে ইলিয়াসের বুকে‌ এবং পিঠে বেঁধে দেন, যাতে তার রক্তক্ষরণ থেমে যায়। ইলিয়াছ সেই অবস্থায় মেশিনগান নিয়ে ক্রমাগত গুলি ছুড়তে থাকেন পাকিস্তানী বাহিনীর ওপর।

ইলিয়াস জগৎজ্যোতিকে পালানোর কথা বললে জগৎজ্যোতি বলে, পালাবো না সবকটাকে শেষ করে তবে যাব। এরপর পাকবাহিনীর গোলার আঘাতে জগৎজ্যোতির দেহ তলিয়ে পড়ে। ইলিয়াস সহযোদ্ধার দেহ কাদার মধ্যে লুকিয়ে সেখান থেকে পালিয়ে আসতে পারেন।

মৃত্যুঃ জগৎজ্যোতি মৃত্যুবরণ করেন ১৯৭১ সালের ১৬ নভেম্বর। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ভাটি বাংলার গেরিলা বাহিনীর কমান্ডার ছিলেন এবং তার অবদানের জন্য পরবর্তীকালে বাংলাদেশ সরকার তাকে বীর বিক্রম উপাধিতে ভূষিত করে। ১৯৭২ সালে মরনোত্তর বীরবিক্রম উপাধি লাভ করেন।

লেখকঃ সাকির আহমদ
আরও পড়ুনঃ

 

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.