বাংলাদেশের স্মরণীয় ও বরণীয় যারা

পৃথিবীর মানচিত্রে দক্ষিণ এশিয়ার ছোট দেশ বাংলাদেশের বাঙ্গালীরাই একমাত্র জাতি; যারা মাতৃভাষার জন্য রক্ত দিয়ে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার সম্মান দিয়েছে। ভাষার জন্য প্রান বিসর্জন দেওয়ার পর মাঠির জন্য প্রান বিসর্জন দিয়ে পৃথিবীতে অমর হয়ে আছে বাঙালিরা।

এ রক্তক্ষয়ী বিশাল যুদ্ধে বাংলাদেশ হারিয়েছে তার অনেক কৃতি সন্তানদের; যারা এখনো স্মরণীয়-বরণীয় হয়ে মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন। তাদের আত্নত্যাগের বিনিময়ে আজ আমরা স্বাধীনভাবে বাংলায় কথা বলতে পারছি, শুধু তাই নয় তাদের জন্যই বাংলাদেশ নামক নতুন ভূখন্ডের জন্ম হয়েছে। আর এ জন্যই ঐ সকল ব্যাক্তিবর্গকে আজও অন্তরের অন্ত:স্থল থেকে বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই।

মূলত ভাষার দাবিতে বাঙ্গালীদের আন্দোলন শুরু হয় ১৯৪৭ সাল থেকে। এ সময় ভারত পূর্ব এবং পশ্চিম পাকিস্তান নামে দুটি রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়। পরবর্তী বছরের (১৯৪৮) ২৩ শে ফেব্রুয়ারী উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে যখন পাকিস্তান  সরকার ঘোষণা করে, তখনি পূর্ব-পাকিস্তানের বাঙ্গালিরা এর প্রতিবাদ করে।

প্রতিবাদের জের ধরে কিছু রাজনীতিবিদ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর ছাত্ররা পাকিস্তান সরকার প্রদত্ত উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা আইন না মেনে তাদের আন্দোলন অব্যাহত রাখে। এ আন্দোলন যখন ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার উপক্রম হয়, তখন কোন উপায়ান্তর না দেখে সরকার পুলিশ নিয়োজিত করে এবং প্রয়োজনে গুলি চালানোর নির্দেশও দেয়।

সরকারের নির্দেশে পুলিশ আন্দোলনকারীদের উপর গুলি ছুড়ে। এ দিনটি ছিলো ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি। এদিন শহীদ হন ঢাকার আব্দুল আউয়াল, ফেনী জেলার আব্দুস সালাম, মানিকগঞ্জ এর রফিকউদ্দিন আহমদ, ময়মনসিংহ জেলার আব্দুল জব্বার, ভারতের মুর্শিদাবাদের আব্দুল বরকত, ভারতের হুগলি জেলার শফিউর রহমান, অজ্ঞাত ছাত্র মোঃ অহিউল্লাহ সহ অগণিত অপরিচিত ছাত্রজনতা।

১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চ থেকে পাকিস্তানীদের গণহত্যা শুরু হয়। পাক-বাহিনীরা  নারী-পুরুষ নির্বিশেষে নিষ্ঠুরভাবে নির্যাতন ও হত্যা করেছে। তাদের কবল থেকে বাঁচতে পারেনি অবলা নারী-শিশুরাও। মুক্তিযুদ্ধাদের সাথে তাল মিলিয়ে নারীরাও প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুদ্ধে অংশগ্রহন করেছে।

বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের খাদ্য, আশ্র‍য় ও চিকিৎসার মাধ্যমে সহায়তা করতে গিয়ে প্রাণ দিতে হয়েছে ভাগীরথীর মতো মমতাময়ী হাজার হাজার মা-বোনকে। এছাড়াও কাঁকন বিবি ,তারামন বিবি, শিরিন বানু মিতিল, আশালতা, রওশন আরা, গীতা, ইরা, নুরজাহান মুর্শীদ, আতিয়া বাগমার, নিবেদিতা দাশ এবং নারায়ণগঞ্জ এর শহীদ লায়লা হকদের  অবদান আমরা কখনো ভুলতে পারবোনা।

যুদ্ধে কেউ কেউ প্রশিক্ষণ নিয়ে, আবার কেউ কেউ প্রশিক্ষণ  ছাড়াও অংশগ্রহণ করেছে। সিলেটের বীরবিক্রম মরহুম ইয়ামিন চৌধুরী, বীরপ্রতীক সিরজুল ইসলাম, আব্দুল গফুর, মোজাম্মেল আলী, হারেছ আলী, উছমান আলী, আরফান আলী সহ জ্ঞাত-অজ্ঞাত হাজার হাজার মুক্তিকামী জনসাধারণদের কথা আজও মানুষের মুখে মুখে শুনা যায়।

বাংলাদেশের মুক্তিকামী মুক্তিযুদ্ধাদের মধ্যে নারায়ণগঞ্জ এর শহীদ আঃরহমান, শরীয়ত উল্লাহ, চুন্নু মিয়া, সাচ্চু, ওমর আলী, আঃ সত্তার, জাসিমুল হক, আবু বকর সিদ্দিক, কামাল উদ্দিন ও মো মোশাররফ হোসেন দের আমরা  শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবো।

কুমিল্লা জেলার গিয়াস উদ্দিন খান, আমিনুল রশিদ, আব্দুল মমিন, ফজলুর রহমান সরকার, ইয়ার আহমদ, মোঃ রফিকুল ইসলাম, আব্দুল হাকিম, রফিজ উদ্দিন এবং গুণেন্দ্র চন্দ্র রতনদের মতো ব্যক্তিবর্গও বরণ করার যোগ্য।

চট্টগ্রাম জেলার ফারুক আহমদ, সিপাহী  মানিক মিয়া, সিরাজগঞ্জ এর ওসমান গণি ও হীরালাল গোস্বামী, খুলনা জেলার সিপাহী অলি আহমদ ও নুরুল হুদা, রাজশাহী জেলার মোনায়েম মঞ্জুর, মোঃ আসাদ আলী, কার্তিক চন্দ্র প্রামাণিক, মোঃ আব্দুর রহমান, বগুড়া জেলার বীর মুক্তিযুদ্ধা আব্দুল সাত্তার প্রমুখ শহীদদের আমরা স্মরণ করি বিনম্রতার সাথে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে পাক-বাহিনীরা বাঙ্গালীদের নৃশংসভাবে নির্যাতন ও হত্যা করেছে। এ সকল শহীদদের অধিকাংশের ও বেশী লোকদের নাম এখনো কেউ জানেনা। আমরা এ সকল নাম জানা না জানা সকল শহীদদের কৃতজ্ঞচিত্তে শ্রদ্ধা নিবেদন করি।

লেখকঃ Samia Rahman
আরও পড়ুনঃ
Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.