বই রিভিউঃ শাওনের বয়ানে হুমায়ূন

হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত অনেকেরই জানা ছিল না যে এতোদিন ধরে তিনি নীরবে নিভৃতে সম্পূর্ণ নিজ খরচে নিজ গ্রামে একটি স্কুল নির্মান করে নিজের বই বিক্রির টাকা থেকেই সেই স্কুলের খরচ চালাতেন। আচ্ছা আপনাদের কারো কি কখনো প্রশ্ন জেগেছিল মনে যে হুমায়ূন এত অর্থ উপার্জন করেছিলেন অথচ তার প্রাক্তন স্ত্রী বা কন্যাদের নামে কোন সম্পত্তি কিনেছিলেন কিনা?

হুমায়ূন তার কোন লেখায় তা উল্লেখ করেননি তাই আমাদেরও তা জানা হয়নি। তিনি গুলতেকিনের নামে ধানমন্ডিতে একটি পাঁচতলা বাড়ি বানিয়েছিলেন এবং বাড়ির নামও দিয়েছিলেন “গুলতেকিন” (এছাড়াও দখিন হাওয়া এপার্টমেন্টেও একটি ফ্ল্যাট উপহার দিয়েছিলেন গুলতেকিনকে)।

সেই বাড়িতে থাকাকালীন সময়ে যখন তার দাম্পত্য সমস্যাগুলো জটিল আকার ধারন করতো তখন তাকে দীর্ঘদিন নীচতলার গেস্টরুমে থাকতে হতো একা। কখনো কখনো বাসা থেকে বের করে দেওয়া হতো তখন তিনি বন্ধুদের বাড়িতে বা কখনো ভাড়া বাড়িতে থাকতেন। বিচ্ছেদ হওয়ার আগে টানা চার বছর দখিন হাওয়ার ফ্ল্যাটে নিভৃত জীবন যাপন করতেন। ঈদের দিন যদি কখনো পরিবারের সাথে দেখা করতে যেতেন তখন এমনও হয়েছে যে তাকে এক ঘন্টা ড্রয়িং রুমে বসে থাকতে হয়েছে, কেউ দেখা করতে আসেনি, এমনকি এক বাটি সেমাইও আসেনি।

শাওনের সাথে বিয়ের পর তিনি প্রায়ই বলতেন- “শোন কুসুম, তোমার আমার যত ঝগড়াঝাঁটিই হোক না কেন, কোনোদিন প্লিজ আমাকে বাসা থেকে বের হয়ে যেতে বলবে না। তুমিও কোনদিন রাগ করে বাসার বাইরে যাবে না।” রাতে একা থাকা নিয়ে তার ট্রমা কাজ করতো। দু:স্বপ্ন দেখতেন কেউ তার গলা চেপে ধরছে। সেই সময় পাশে থাকা মানুষটি কপালে হাত দিয়ে ঘুমটা ভাঙিয়ে দিলেই নাকি দু:সহ স্বপ্নের সমাপ্তি ঘটতো। এ নিয়ে একটা বইয়ের উৎসর্গপত্র লিখেছিলেন তিনি। “বোবায় ধরা নামক এক জটিল ব্যাধি আমার আছে।……..আতঙ্কে অস্থির হয়ে আমি চিৎকার করতে থাকি। তখন একটা কোমল স্পর্শ আমার কপালে পৌঁছে। গভীর মমতায় একজন বলে, ‘এইতো আমি আছি’। আমার ঘুম ভাঙ্গে, আমি স্বাভাবিক হই।
মমতাময়ী শাওনকে।”

এমন আরো অনেক কৌতুহলী তথ্য যা আমাদের জানা, অর্ধ-জানা, অজানা। হুমায়ূনের ব্যক্তিজীবন, লেখা, হিমু, শুভ্র, মিসির আলী চরিত্রের পটভূমি, হুমায়ূনের একাকীত্ববোধ, শাওনের গানমুগ্ধ হওয়া, তাদের প্রণয় ও পরিণয় এবং প্রবল সমালোচনার তোপেও সেই সম্পর্ক টিকে থাকা, সন্তানদের জন্য বাবার হাহাকার, ছেলেমানুষী, কাছের মানুষের বিপদে এক লহমায় ব্যাংক একাউন্ট খালি করে দশ লাখ টাকা দিয়ে দেওয়া, হুমায়ূনের উদাসীনতা, সচেতনতা, জীবনবোধের ছোট ছোট ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কথামালা নিয়ে এই বই।

#বইটির নাম “শাওনের বয়ানে হুমায়ূন”। মূলত সাক্ষাৎকারমমূলক বই। চৌকস প্রশ্ন এবং বুদ্ধিদীপ্ত গুছানো উত্তর- এই দুয়ের উপর নির্ভর করে এ জাতীয় বইয়ের স্বার্থকতা বা সফলতা। সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীর ভাষা প্রমিত হলে আরেকটু বেশি ভালো লাগতো। তবে শাওনের ভাষা প্রমিত এবং বক্তব্য খুবই স্পষ্ট, সুন্দর, গোছানো এবং জোরালো।

#পাঠ_প্রতিক্রিয়া: কিছু সত্য, কিছু মিথ্যা, কিছু বানোয়াট, কিছু ছলনা এইসবের মিলিত একটা হাস্যরসাত্মক উদ্ভট কিছু পড়তে যাচ্ছি এই পূর্ব-মনোভাব নিয়ে বইটি শুরু করি। অথচ যতই বইটির গভীরে গিয়েছি ততই চমৎকৃত যেমন হয়েছি, কিছুটা বিরক্তও হয়েছি। বইয়ের প্রচ্ছদ সুন্দর পরিচ্ছন্ন। হুমায়ূন আহমেদের চেহারা মাঝখান থেকে বিচ্ছিন্ন করা। আসলেই তো লোকটার ছিল অনেকগুলো ভিন্ন ভিন্ন সত্ত্বা। কাগজ, বাইন্ডিং বেশ ঝকঝকে। বানান ভুল বলতে গেলে ছিলোই না। এটা পাঠ-কে আরামদায়ক করেছে। বইটি পড়ে আমার শাওনের প্রতি যেমন কিছু অভিযোগ তৈরি হয়েছে তেমনি কিছু অনুযোগও তৈরি হয়েছে হুমায়ূনের প্রতি।

প্রয়োজনের অতিরিক্ত জায়গায় উল্লেখ করা হয়েছে যে বিচ্ছেদের আগে হুমায়ূন আহমেদ চার বছর পরিবার বিচ্ছিন্ন ছিলেন। শাওনের কারণে যে তিনি পূর্ব সংসার ত্যাগী হননি বরং দৃশ্যপটে শাওনের প্রবেশের পূর্বেই যে তার দাম্পত্যজীবনে ঘোর অমানিশা চলছিল তা বারবার বলবার চেষ্টা। এই বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া যেতো। হুমায়ূন নিজেই তার কোন এক স্মৃতিকথায় এটা লিখে গেছেন। তবুও সত্য বারবার বললে তা বানোয়াট শোনায়।

শাওনের বয়ান- খেয়ালী হুমায়ূনের প্রায়ই হাত খালি হয়ে যেতো তখন স্কুলের খরচের (যা প্রায় লক্ষাধিক) টাকা শাওনের মার কাছ থেকে ধার নিতেন। শাওনকে বিয়ে করার আগে এইরকম অর্থকষ্টের সময়টা তাহলে হুমায়ূন কিভাবে সমাধান করতেন? এরকম সময়ে মানুষ তো আশেপাশের জন থেকেই ধার নিয়ে থাকে, এটা খুব রঙিন করে বলবার কিছু না। কিন্তু বইয়ের উপস্থাপনে শাওনের মায়ের অর্থাধিক্যের তুলনায় হুমায়ূনের অর্থাভাবের একটা তুলনামূলক চিত্র উঠে এসেছে যা দৃষ্টিকটু লেগেছে। তবে এমনও হতে পারে যে শাওন তার বিবাহ পরবর্তী সময়ে এতোবার শুনেছেন যে হুমায়ূন আহমেদের সম্পদ দেখেই সে বিয়ে করেছে, এই বক্তব্যের বিপরীতে প্রমাণক উপস্থাপনে নিজেকে কলংকমুক্ত করতে গিয়ে অনিচ্ছাকৃত হলেও হুমায়ূনকে কিছুটা ছোট করেই দেখিয়ে ফেলেছেন যা বইটির একটি নেগেটিভ দিক।

গুলতেকিনের বই (মিলন ফারাবী সম্পাদিত), আয়েশা ফয়েজের ‘শেষ চিঠি’, হুমায়ূন আহমেদের আত্মকথামূলক সবগুলো বই এবং এই বইটি পড়ে আমার যে উপলব্ধি হলো তা বর্ণনা করি।

হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন একজন আবেগী, রোমান্টিক, খেয়ালী মানুষ। তার চরিত্রগুলোর হেয়ালীপনার অনেকটাই তার নিজের চরিত্র থেকে ধার করা। তিনি লেখালেখি করে প্রচুর টাকা আয় করতেন আর সেগুলো দিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করে ক্ষতির মুখে পড়তেন। যখন ইচ্ছে যেভাবে ইচ্ছে টাকা খরচ করতেন। এই অতি রোমান্টিসিজম, হেয়ালিপনা, বেহিসেবি চাল তার পরিবারের সাথে তার মনোমালিন্যের সূত্রপাত ঘটায় এবং একসময় তা চূড়ান্তরূপ নেয়। তার পরিবারের সাথে যখন তীব্র বিরোধ আর মন কষাকষি, তখনই কিশোরী শাওনের সাথে তার সখ্যতা। তিনি গান ভালোবাসতেন। শাওনের গানের গলা অপূর্ব। ছোট্ট শাওনকে তিনি চিরকুট দিতেন। অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম যে সেগুলোতে নিজের নামও স্বাক্ষর করতেন। মানে লুকোছাপা বা ভান ভনিতার বালাই ছিল না। মানসিকভাবে একাকী হুমায়ূন কিশোরী শাওনের সঙ্গ পছন্দ করতেন।

#নিজস্ব_মতামত: হুমায়ূন আহমেদ আটাশ বছর বয়সে প্রায় ষোল বছরের দশম শ্রেনীতে পড়ুয়া গুলতেকিনকে বিয়ে করেন। ততদিনে তার মাত্র দুটো বই বের হয়েছে। ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষক। সে তুলনায় অভিজাত পরিবারের একটি সাধারণ মেয়ে ছাড়া গুলতেকিনের বলবার মতো আর কোন পরিচিতি ছিল না সেসময়। যদিও হুমায়ূন আহমেদ সারাজীবন নিজেকে দরিদ্র সহায় সম্বলহীন হিসেবে তুলে ধরে আনন্দ পেতেন। হুমায়ূনের ভাষায় তার কিশোরী স্ত্রী ছিলেন তার উপন্যাসের সকল নায়িকার মতোই রূপবতী। অথবা কি জানি তার কাছে হয়তো পৃথিবীর তাবৎ মেয়েই অসম্ভব রূপবতী। গুলতেকিনের তালাক সম্পর্কিত বইটি পড়ে তাকে খুব দৃঢ় ব্যক্তিত্বের আপোসহীন মানুষ মনে হয়েছিল। এমনকি হুমায়ুন আহমেদ নিজেও কখনো প্রাক্তন স্ত্রীকে পরিণত বয়সে খুব রোমান্টিক বা আবেগী এমন হিসেবে বর্ণনা দেননি। হয়তো এখানেই হুমায়ূনের সবসময়ের অতি রোমান্টিক মনের সাথে তার বিরোধ ঘটে। এই বিরোধের অবসানে দুপক্ষের কেউ হয়তো আর এগিয়ে আসেননি। ফলে নিশ্চিত ভাঙনের মুখে সম্পর্কের মৃত্যু হয়। তার নব্বইয়ের দশকের বইগুলোর কাহিনীতে এই নড়বড়ে দাম্পত্যের আঁচ খুব ভালোভাবে টের পাওয়া যায়।

পঞ্চাশোর্ধ হুমায়ূন যখন একাকী বিষন্ন তখন কিশোরী শাওনের সাথে তার সখ্যতার শুরু। আমরা যেখানে হুমায়ূনের বই পড়েই তার ভক্ত সেখানে চোখের সামনে একজন পুরো হুমায়ূন, তার মুগ্ধ দৃষ্টি, বারংবার তার আবাহণ, এতো গুরুত্ব, তার চিরকুটের ছন্দ- একটা কিশোরীর কি মুগ্ধ না হয়ে বা প্রেমে না পড়ে উপায় আছে! এরপর শাওনের মা-র মার খাওয়া, এমনকি অবাধ্য হওয়ায় মায়ের স্ট্রোক, মানুষের নানামুখী মুখরোচক বাক্যবান, এইসব সত্ত্বেও সম্পর্কে থেকে যাওয়া- শাওনের সেই সময়ের একনিষ্ঠতা নিরপেক্ষ পাঠককে ভাবাবে। ফেসবুকে একটা কমেন্ট করতেও চিন্তা করতে হয় কী কী গালি শুনতে হবে সেখানে এতোকিছু সহ্য করে টিকে থাকা, হুমায়ূনের পাশে থাকা, গুছিয়ে গুছিয়ে হুমায়ূন আহমেদের স্মৃতিগুলোকে যত্ন করে তুলে ধরার গুনটা আমাকে মুগ্ধ করেছে।

ব্যক্তি শাওনের হয়তো অনেক দোষ লোকের চোখে। কিন্তু যে মানুষটি হাত ধরে এই মেয়েটিকে এইসব তর্ক বিতর্কের মুখে এনে ফেলেছেন তিনি কি তার দায় এড়াতে পারেন? বেঁচে থাকতে তিনি তার নিজের অনুভব, শাওনের জন্য তার আকুল হওয়া আরো বিশদ লিখে যেতে পারতেন। নাকি তিনি প্রথম বিয়ে নিয়ে লিখতে লিখতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন আর দ্বিতীয় বিয়ে নিয়ে বিস্তারিত লিখতে সংকোচবোধ করেছিলেন। এই সংকোচের সংকটে পড়ে হুমায়ূন ভক্তরা এখনো শাওনকে নিয়ে অশ্রাব্য ভাষা ব্যবহার করে। আর হুমায়ূন আহমেদও আমাদের মতোই দোষেগুনে মানুষ, ফেরেশতা নন। তবে বিচ্ছেদের পরেও কখনো তার প্রথম স্ত্রীকে নিয়ে অসম্মান করে কোন লেখা লেখেননি। সেজন্য তাকে সম্মান জানাই। আর শাওনের জন্যও ব্যক্তিগত মুগ্ধতা রেখে গেলাম। লেখককেও ধন্যবাদ (যদিও বইয়ের দামটা একটু বেশি) আমাদের নিকট এই বইটি পৌঁছে দেওয়ার জন্য।

বইঃ শাওনের বয়ানে হুমায়ূন
লেখকঃ মা হী
প্রকাশনীঃ অবসর

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.