ফেনীর কৃতি সন্তান গাজীউল হক

ফেনীর কৃতি সন্তান গাজীউল হক ১৯২৯ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন ফেনী জেলার ছাগলনাইয়া থানার নিচিন্তা নামক গ্রামে। তিনি যদিও পেশায় একজন কবি, লেখক, গীতিকার ও আইনজীবি কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের কাছে পরিচিতি লাভ করেন একজন ভাষাসৈনিক হিসেবে।

গাজীউল হকের শিক্ষাজীবন শুরু হয় মক্তবে পড়াশুনার মাধ্যমে। প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করেন কাশিপুর স্কুল থেকে। উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের পড়াশুনা করেন বগুড়া জেলা স্কুল থেকে। ম্যাট্রিক পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে পাশ করেন ১৯৪৬ সালে। পরবর্তীতে, আই.এ. পরীক্ষা দেন বগুড়া আজিজুল হক কলেজ থেকে। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে অনার্স সম্পন্ন করেন।

 ১৯৫২ সালে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন গাজীউল হক। কিন্তু, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তার এম এ ডিগ্রী ছিনিয়ে নেয় ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দানের কারনে। পরবর্তীতে অবশ্য তাকে তার ডিগ্রী ফিরিয়ে দেওয়া হয়। আইন শাস্ত্র নিয়েও পড়াশুনা করেন তিনি। ১৯৬৩ সালে ঢাকা হাইকোর্ট তাকে আইন ব্যবসায়ে সনদপত্র প্রদান করে।

তিনি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে আন্দোলনে যোগদান করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নরত অবস্থায়। এজন্য জেলেও যান তিনি। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের ফলে প্রাণ হারায় অনেক ছাত্র-জনতা। এই ঘটনার স্মৃতিতে তিনি ‘ভুলব না ভুলব না ভুলব না এই একুশে ফেব্রুয়ারি ভুলব না’ নামক একটি গান রচনা করেন। ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত গাজীউল হকের এই গানটি গেয়ে ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত প্রভাতফেরি করা হতো।

১৯৫৭ সাল থেকে তার কর্মজীবন শুরু হয়। আইনজীবী হিসেবে কাজ করেন দীর্ঘদিন। বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টে যোগদান করেন ১৯৭২ সালে। কাজের পাশাপাশি দেশ ও দশের জন্য কাজ করেন তিনি। আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যও ছিলেন তিনি। এছাড়া গাজীউল হক প্রেস ইন্সটিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআইবি) এর চেয়ারম্যান ছিলেন। ভাষা আন্দোলন ছাড়াও তিনি ১৯৬২ এর শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৪ এর সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী আন্দোলন, ১৯৬৯ এর গণআন্দোলন,  ১৯৭১ এর স্বাধীনতা যুদ্ধ, ১৯৮০ এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহন করেন।

গাজীউল একজন লেখকও ছিলেন। তার রচিত ‘জেলের কবিতা’ প্রকাশিত হয় ১৯৫৯ সালে। ১৯৭১ সালে এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এগিয়ে চলো এবং Bangladesh Unchained প্রকাশিত হয়। এছাড়াও Media Laws & Regulation in Bangladesh, মোহাম্মদ সুলতান, বাংলাদেশের গণমাধ্যম আইন, এখানে ও সেখানে, একটি কাহিনী প্রকাশিত হয়।

গাজীউল ‘গণপ্রজাতন্ত্রী  বাংলাদেশ সরকার’ কর্তৃক প্রদত্ত ‘একুশে পদক’ লাভ করেন ২০০০ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি। একুশে পদক ছাড়াও  রাষ্ট্রভাষা পদক, সম্মাননা স্মারক এবং শেরেবাংলা জাতীয় পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৯৭ সালে ৭ মার্চ তিনি ভাষাসৈনিক পদক পান৷ ভাষাসৈনিক হিসেবে  সম্মানসূচক ডক্টর অব লজ ডিগ্রি ও লাভ করেন। এছাড়াও পাবনা থিয়েটার পুরস্কার লাভ করেন ১৯৭৭ সালে। বাংলা একাডেমী তাকে সম্মানসূচক ফেলোশিপ প্রদান করে ১৯৯৯ সালের ২৬ নভেম্বর।

২০০০ সালে তিনি বাংলাদেশ জার্নালিস্ট এ্যাসোসিয়েশনের উপদেষ্টা হিসেবে বিশেষ সম্মাননা স্মারক লাভ করেন। এছাড়া তার জীবদ্দশায় অনেক ক্রেস্ট, শ্রদ্ধাঞ্জলি ও সম্মাননা পান। ভাষা আন্দোলনের স্থপতি সংগঠন তমদ্দুন মজলিস-এর পক্ষ থেকে মাতৃভাষা পদক পান৷ ‘বিশ্ব বাঙালি সম্মেলন’ পুরস্কার লাভ করেন  ২০০০ সালের ১০ জুলাই৷ ‘জাহানারা ইমাম পদক’  পান ২০০১ সালে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির পক্ষ থেকে। বঙ্গবন্ধু আইনজীবী পরিষদের পক্ষ থেকে ‘বঙ্গবন্ধু পদক’ লাভ করেন।

জীবনের শেষ সময়ে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে ঢাকা স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন তিনি। চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ৮০ বছর বয়সে  শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ২০০৯ সালের ১৭ জুন।

লেখকঃ সামিয়া

আরো পড়ুনঃ

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.