পঞ্চখন্ডে শিক্ষার প্রসারে প্রমথ নাথ দাসের অবদান

পঞ্চখন্ডের আদর্শ কৃষক বাবু প্রমথ নাথ দাস ছিলেন আধুনিক বিয়ানীবাজারের এক রূপকার। তিনি ছিলেন খ্যাতিমান পুরুষ, বিশিষ্ট দানবীর ও শিক্ষানুরাগী ব্যক্তি।

জন্মঃ

শ্রীহট্ট জেলার পঞ্চখন্ডের দাসগ্রামে প্রমথ নাথ দাস ১৯০০ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মুন্সী পবিত্রনাথ দাস। মাতার নাম সরলা সুন্দরী দেবী। প্রমথনাথ দাসের দাদা ছিলেন মুন্সী গৌরচন্দ্র দাস।

তিনি বাংলা, ফার্সি ও ইংরেজি ভাষায় দক্ষ ছিলেন। ফার্সি জানার যোগ্যতায় তিনি বরিশাল জজ কোর্টে দো-ভাষীর চাকুরী করে মুন্সী খেতাবে ভূষিত হন। সেই দাদার নামে দাসগ্রামস্থ তাঁর বসতবাড়ি ‘গৌরচন্দ্র ধাম’ নাম নামে অভিহিত ছিল। এ বাড়ী ছিল এক সংস্কৃতি কেন্দ্র। পূজা ও বিভিন্ন উপলক্ষে এখানে বসতো সার্বজনীন আসর।

শিক্ষাজীবনঃ

প্রমথনাথ দাস বাল্যশিক্ষা গ্রহণ করেন গ্রামের পাঠশালায়। ১৯১৭ সনে কাছাড়ের শিলচর হাইস্কুল থেকে মেট্রিক এবং ১৯১৯ সনে সিলেট এমসি কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। ১৯২০ সনে সাবুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে বি.এজি ক্লাসে ভর্তি হলেও বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে বিদেশি শিক্ষা ও বিদেশী পণ্য বর্জনের ডাকে পিতার নির্দেশে চুড়ান্ত পরীক্ষার আগেই বাড়ি ফিরেন। আর পড়ালেখা হয়নি।

যেভাবে গড়ে উঠে স্কুল কলেজঃ

বৃটিশ আমল কিংবা নবাবী আমলের পূর্বে পঞ্চখণ্ড তথা বিয়ানীবাজার অঞ্চলে হিন্দু সমাজে টোল শিক্ষার প্রচলন ছিলো। আর মুসলিম সমাজে ছিলো মক্তব শিক্ষার প্রচলন। কোন কোন এলাকায় সর্বজনীন প্রাইমারি স্কুল কিংবা এম.ই স্কুল (মিডিল ইংলিশ স্কুল) ছিল। এই অনগ্রসর এলাকায় শিক্ষার বিকাশ ও প্রসারে আধুনিক শিক্ষা প্রবর্তন করেন প্রমথ বাবুর পিতা পবিত্র নাথ দাস।

পবিত্র নাথ দাস ১৯১৭ সনে প্রায় ছয় একর জমি দানপূর্বক তাঁর অপুত্রক জেঠা হরগোবিন্দ দাসের নামে হরগোবিন্দ হাই স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। তখনকার দিনে জাহাজে করে কলকাতা থেকে ঢেউটিন, লোহার খুঁটি ও প্রয়োজনীয় মূল্যবান কাঠ দিয়ে সুদৃশ্য টিলার উপরিভাগ সমতল করে ৬০ হাত দীর্ঘ ৩টি বিল্ডিং নির্মাণ করা হয়।

এক বিল্ডিং থেকে আরেক বিল্ডিংয়ে যাওয়া আসার জন্যে মধ্যখান দিয়ে শৈল্পিক টিনশেড বানানো হয়। স্কুল টিলা সন্নিহিত উত্তরের নীচু ভূমিকে করা হয় পূর্ব পশ্চিম বিশাল খেলার মাঠ। খেলার মাঠ সংলগ্ন পশ্চিম টিলায় স্থাপিত হয় প্রধান শিক্ষকের বাসভবন।

স্কুল প্রতিষ্ঠার পরপরই বাবু পবিত্র নাথ দাস স্কুলটির সরকারি স্বীকৃতি আদায়ে তৎপর হয়ে ওঠেন। সে সময় হরগোবিন্দ হাই স্কুল আসাম ভ্যালির মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হাই স্কুলে রূপ নেয়। বাবু পবিত্র নাথ দাসের প্রচেষ্টায় অবশেষে ১৯৪১ সালে স্কুলটি স্থায়ী স্বীকৃতি লাভ করে।

১৯৫৩ সন পরবর্তী সময়ে আগত নতুন হেডমাস্টার মহোদয়ের উদ্যোগে পঞ্চখণ্ড মুকুট পরিয়ে পঞ্চখণ্ড হরগোবিন্দ হাই স্কুল (পি এইচ জি হাই স্কুল) নামে অভিহিত হয়। পরবর্তীতে এই স্কুলের ছাত্র (গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষামন্ত্রী) নূরুল ইসলাম নাহিদ-এর হাত ধরে পি এইচ জি হাই স্কুলটি সরকারিকরণ হয়।

পিতার দেখানো পথ অনুসরণ করলেন প্রমথ নাথ দাস। ১৯৪৭ সালে পাক-ভারত বিভক্তির ফলে হরগোবিন্দ হাই স্কুলে নারী শিক্ষা বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৫৭ সনে দাসগ্রামে পরিবারের নিজস্ব জমিতে বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মহিলা শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে ৬ষ্ঠ শ্রেণি চালু করেন।

১৯৬৫ সনে পাক-ভারত যুদ্ধে প্রমথ বাবু বিশেষ নিরাপত্তা আইনে কারা বরণ করলে স্কুলটি পরিচালনায় স্থানীয় ব্যক্তিবর্গকে অনুরোধ জানান ও বিদ্যালয়ের নামে প্রয়োজনীয় জমি উইল করে দেন। ফলে নারী শিক্ষা প্রসারে ১৯৬৬ সনে বিয়ানীবাজার বালিকা বিদ্যালয় যাত্রা শুরু করে।

১৯৬৭ সনে বিয়ানীবাজারে উচ্চ শিক্ষার জন্য কলেজ প্রতিষ্ঠার সর্বজনীন উদ্যোগে হাজী আব্দুর রহীম (বচন হাজী) সাহেবের নেতৃত্বে কয়েকজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি প্রমথ বাবুকে ধরলেন। বচন হাজীর সাথে ছিল বাবুর হৃদ্যতার সম্পর্ক।

তাই এমন আবদার শুনে প্রমথ বাবু সেদিন কশাঘাতের স্বরে বললেন, হিন্দু ঘটি-ভাটি-পাটি ও সোনাদানা নিয়ে চলে গেছে ঠিকই। কিন্তু মাটি-জিরাত তো নিয়ে যায়নি। তা গেলো কৈ? তোমাদের বাঁচতে চাই মাটি, মরলেও চাই মাটি। আর হিন্দুরা মরে গেলে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। তাই তোমরা জমি দিতে পারবে না।

ক্ষোভ ঝেড়ে অবশেষে তাঁরই হাতে গড়া পিতার স্মৃতি রক্ষার্থে বিনোদনের জন্য নির্মিত পবিত্র স্মৃতি ভবনসহ প্রয়োজনীয় জমি কলেজের নামে উইল করে দেন। সাথে দিলেন তাঁর ব্যক্তিগত লাইব্রেরির মুল্যবান সংগ্রহ। এ সময় বাবুর আর্থিক অবস্থা ছিল অতি শোচনীয়। ফলে এলাকার অন্যান্য বিশিষ্টজনদের শ্রমে-ঘামে ১৯৬৮ সনের ১৫ আগস্ট বিয়ানীবাজার কলেজটি আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে।

এভাবে বিয়ানীবাজারে সংস্কৃতি, শিল্প, কৃষি চাষাবাদেও ছিল প্রমথ নাথ দাসের অশেষ অবদান। তিনি একজন আদর্শ কৃষক ছিলেন। এদেশে তিনিই প্রথম ব্যারো চাষের প্রবর্তন করেন। এতদঞ্চলে কলের লাঙল দিয়ে চাষাবাদ শুরু করেন।

পঞ্চখণ্ডের বাবুর বাজারে ধান ভাঙ্গার কল, আখড়াই মেশিন, জল সেচের পাম্প ইত্যাদি স্থাপন করেন। এদেশে স্বনির্ভর গ্রাম কর্মসূচি তিনিই প্রবর্তন করেন। জনহিতৈষী প্রমথ বাবু এভাবে পঞ্চখণ্ড গোলাবিয়া পাবলিক লাইব্রেরীর ভূমি, বিয়ানীবাজার ডাকঘর, বিয়ানীবাজার রামকৃষ্ণ সেবাশ্রম প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা রাখেন।

প্রমথ বাবুর জীবনের শেষ দিকে অভাব আর ঋণের দায়ে শেষ পর্যন্ত দাসগ্রামস্থ তাঁর বসতবাড়ি ‘গৌরচন্দ্র ধাম’ বিক্রি করে দেন। পরে কালাচাঁদ বাড়ীর কাছে বাজারের কিনারে ঘর তুলে পরপারে যাত্রার প্রহর গুনতে শুরু করেন।

মৃত্যুঃ

অবশেষে বিয়ানীবাজারের মাটি ও মানুষের পরম বন্ধু বাবু প্রমথ নাথ দাস ১৯৭৮ সনের ১২ ফেব্রুয়ারি বিকাল ৫ ঘটিকায় তাঁরই দানে প্রতিষ্ঠিত দাসগ্রামস্থ কালাচাঁদ মিলন মন্দির বানপ্রস্থ আশ্রমে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

বাবু প্রমথ নাথ দাস ছিলেন পরোপকারী এক সংস্কৃতিমনা মানুষ। অখণ্ড ভারত গেলো, পাকিস্তান গেলো, এখন স্বাধীন বাংলাদেশ আমল চলছে। কিন্তু বাবু প্রমথ নাথ নেই। তিনি দেশ ও মাটিকে খুব ভালবাসতেন। তাঁর স্মৃতির উদ্দেশ্যে পিএইচজি স্কুল মার্কেটের নামকরণ হয় প্রমথ বিপণি।

বিয়ানীবাজারের প্রতিষ্ঠানগুলো তাঁদের স্মৃতি বহণ করে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

লেখকঃ আরিফ হাসান
আরও পড়ুনঃ
Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.