দক্ষিণ মৈশুন্দির সব দরজায় কড়া নেড়ে নেড়ে

শহীদুল জহিরকে সম্ভবত এখন আর শুধু লেখক বলার উপায় নেই, নগর জীবনের ম্যাজিক রিয়ালিজম লিখতে লিখতে তিনি নিজেই আমাদের সময়ের আরবান লিজেন্ড হয়ে গেছেন৷ আমাদের বিবর্ণ শহরে সারা জীবন থেকেও তিনি যে অদেখা আলোয় রাঙা জগত নির্মাণ করে গেছেন, শুধু প্রবল ঘোরগ্রস্ত হয়েই সে জগতের প্রবেশদ্বারের খোঁজ পাওয়া যায়৷

লেখালেখি অনেকেই করে কিন্তু লেখক সবাই হয়ে উঠতে পারে না – আর প্রকৃত লেখকের জীবন যাপন করাতো বহু দূর অস্ত৷ তাঁর অনন্য স্বাতন্ত্র্য – জীবনে-যাপনে-চলনে-বলনে সর্বোতভাবে একজন প্রকৃত লেখক হওয়া৷ নিভৃতচারী জীবন-যাপন, সাক্ষাৎকারে অনীহা, লেখা ছাপানোতে অনাগ্রহ, ঋষিসুলভ ধ্যানমগ্নতা – সব মিলিয়ে, তিনি নিজে গল্প উত্তমপুরুষ বহুবচনে ‘আমাদের’ বলে লিখলেও, তাঁর নিজের জীবনের গল্প ছিলো নামপুরুষ একবচনে একান্তই ‘তাঁর’ নিজের – তিনি ‘আমাদের’ কেউ ছিলেন না৷

তিনি বিপুলভাবে অপঠিত, তাঁর নাম জনসাধারণে অপ্রচলিত৷ একটি মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ছিলেন, কিন্তু কিভাবে পাদপ্রদীপের আলো এড়িয়ে অজ্ঞাতনামা হয়েই রইলেন সে এক রহস্য৷ ক্ষমতার কেন্দ্রে থেকেও বিস্ময়করভাবে চিরকাল লিখে গেলেন প্রান্তজনের উপাখ্যান৷ তাঁর ব্যাক্তিজীবনও অদ্ভুত! কখনো বিয়ে করলেন না। কেন করেন নি তার ভালো কোন ব্যাখ্যাও কখনো দেন নি। নিঃসঙ্গ বেঁচে থেকে থেকে সবার অজ্ঞাতসারেই চলে গেলেন৷

কখনো মনে হয় ‘আবু ইব্রাহিমের মৃত্যু’ আসলে তাঁর ছদ্ম-আত্মজীবনী৷ বারবার শালার এই কেরাণির চাকরিটা ছেড়ে দেবো বলা, চেয়েও না পাওয়ার বেদনায় ভোগা, অপরাধ করতে গিয়ে বিবেকের তাড়নায় পর্যুদস্ত হওয়া লোকটা সম্ভবত তিনি নিজেই৷ তাঁর যাপিত জীবনের বিবিধ সম্ভাবনায় এই ঘটনাক্রমও প্রবলভাবে সম্ভাব্য ছিলো৷ জীবদ্দশায় তিনি এটা প্রকাশ করতে চান নি৷ তার কারণ কি এটাই?

ভাবতে অবাক লাগে আমি যখন ঢাকা শহরে ছিলাম তখনও তিনি বেঁচে! তিনিও নাকি মুহসীন হলের ছিলেন, মাঝে মাঝে এখানে সেখানে যে প্রৌঢ়দের পুরনো দিনের স্মৃতি রোমন্থন করতে দেখেছি, তাদের মধ্যে কি তিনিও ছিলেন?

ভারতে সম্মান করার জন্য বিশিষ্ট ব্যাক্তিত্বদের অমুকজী তমুকজী বলার চল রয়েছে৷ বাংলাদেশে সে রকম কিছু চালাতে না পেরে দেখি ইদানিং স্যার বলা শুরু হয়েছে৷ শহীদুল জহির শব্দবন্ধে কেন জানি কোন অভিধার প্রয়োজন হয় না, শুনলেই চোখের সামনে বইয়ের পেছনের ফ্ল্যাপে দেখা পাসপোর্ট ছবির বিষাদিত মুখাবয়ব সম্ভ্রম জাগানিয়া হয়েই ভেসে ওঠে৷

শহীদুল জহিরের সমাধি কোথায় জানি না৷ সার্চ করে জানতে চাইও না৷ চাই দক্ষিণ মৈশুন্দির সব দরজায় কড়া নেড়ে নেড়ে জিজ্ঞেস করতে – আচ্ছা শহীদুল জহির এখন কোথায় থাকেন? খুব ইচ্ছে করে অনেক খুঁজে খুঁজে পাওয়া ধূলোপড়া সমাধিতে সন্ধ্যায় চুপচাপ বাতি জ্বেলে রেখে আসতে – যেন আলো দেখে দূর থেকে মহল্লাবাসীরা ফিসফিস করে – এতো বছর পর কে বা কারা গোরবাসীকে স্মরণ করছে?

পুনশ্চ: দুইটা জিজ্ঞাসা ছিলো তাঁর সম্পর্কে৷ কমেন্টে থাকলো, কারো জানা থাকলে জানান৷

লেখকঃ Nowsher Don

আরও পড়ুনঃ

 
 
Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.