“আমি বাপু নিরীহ নিপাট ভদ্দরলোক”

১। অসাধারণ প্রতিভাধর রম্য রচয়িতা এবং ১৭ টি ভাষা যার দখলে , যে ভাষায় উনি কথা থেকে শুরু করে লিখতে পযর্ন্ত পারেন । রাশিয়ান ভাষায় “প্রেম “উপন্যাসের অনুবাদক । “গীতা” যার সম্পূর্ণ মুখস্ত আর রবীন্দ্রনাথের “গীতবিতান” টপ টু বটম ঠোঠস্ত। যদি তাকে পণ্ডিত বলা হয় তাহলে কি আপত্তি থাকতে পারে?

বিশ্বভারতীতে পড়াশোনার সময় একবার রবীন্দ্রনাথের হাতের লেখা নকল করে ভূয়া নোটিশ দিলেন : “আজ ক্লাশ ছুটি ” আর সবাই মনে করল রবীন্দ্রনাথ ছুটি দিয়ে দিয়েছেন ।

জার্মানে যে সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করছেন সে সময়ে “আইনস্টাইন” সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। একবার জার্মানে জোকস প্রতিযোগিতা। লোকাল জার্মান ভাষায়। চিন্তা করা যায় বাংলাদেশের এক সিলেটি সন্তান লোকাল জার্মান ভাষায় জোকস বলে সেকেন্ড প্রাইজ জিতে নিলো?

এতক্ষণ যে ব্যক্তির কথা বললাম তিনি সৈয়দ মুজতবা আলী!

২। আজ এই সাহিত্যিকের জন্মদিন।

যে কোনো আড্ডায় ঘন্টার পর ঘন্টা পৃথিবীর তাবত বিষয় নিয়ে অনর্গল বলে যাওয়া তার কাছে নস্যি। একবার এক রাষ্ট্রদূত তার সাথে সাক্ষাত করে আলাপ করলেন। পরে সেই রাষ্ট্রদূত বলেছিলেন, “আমি জীবনে এত অল্প সময়ের মধ্যে পৃথিবীর এত বিষয়ে আলাপ শুনি নাই, যেটা সৈয়দ মুজতবা আলী আমাকে শুনিয়েছিলেন অল্প কয়েক ঘন্টার মধ্যে।

“বংগিয় শব্দকোষ” নামে একটি অভিধান বের হয়েছে কোলকাতা থেকে লেখক হরিচরন গংগোপাধ্যায়। বাংলায় বৃহত অভিধানগুলোর মধ্যে একটি। সেই হরিচরন গংগোপাধ্যায় মারা যাবার পূর্বে বলেছিল, “আমার অভিধান যদি কোনো সময় সংশোধন করার প্রয়োজন হয় তাহলে যেন সৈয়দ মুজতবা আলী সেটা করে।” তাহলে বুঝুন মুজতবার বাংলা ভাষায় কত গভীর দখল ছিল।

৩। সরস্বতী পূজার এক সকাল। সৈয়দ মুজতবা আলী হাঁটতে গিয়েছেন গঙ্গার ঘাটে। বেলা প্রায় দশটা। গৌরবর্ণ সৌম্য-কান্তি আলী সাহেবের কাছে হঠাৎ হাজির এক বৃদ্ধা। সঙ্গে তার ছোট্ট নাতনী।

বৃদ্ধা আলী সাহেবকে অনুরোধ করলেন- বাবা আমার বাড়ির পূজাটা করে দাও। পুরোহিত এখনো আসেনি, আমি পুরুত খুঁজতে বেরিয়েছি। বাচ্চাটা না খেয়ে অঞ্জলি দেবে বলে বসে আছে।

বৃদ্ধার অনুনয়ে, আরও বিশেষ করে বাচ্চাটার মুখের দিকে চেয়ে, আলী সাহেব বৃদ্ধার বাড়িতে গেলেন। বিশুদ্ধ সংস্কৃত মন্ত্রোচ্চারণে, যথাবিহিত পূজা পদ্ধতি মেনে, তিনি সরস্বতী পূজা করলেন। বাড়ির লোকও খুব খুশী। দক্ষিণা নিয়ে মুজতবা আলী সাহেব বিদায় নিলেন।

পরে মুজতবা আলী বলেছিলেন- জানিনা মাতা সরস্বতী এই বিধর্মীর পূজায় অসন্তুষ্ট হলেন কিনা! তবে আশা করি তিনি উপোষী বাচ্চাটির শুকনো মুখের দিকে চেয়ে এই অধমকে ক্ষমা করবেন।

মুজতবা আলী একবার ছেলের নাম রাখলেন “ভজুরাম”, সবাই জিজ্ঞেস করল এমন বিদঘুটে নাম কেনো রাখলেন? তিনি বললেন “সন্তানের নাম রাখা এক বিশাল ঝামেলার ব্যাপার, নেপালে দারোয়ানকে বলে “ভজুরাম”, তাই গিন্নিকে এই নাম বললাম যাতে কখনও আমাকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস না করে

তাঁকে একবার এক জার্মান পণ্ডিত জিজ্ঞেস করেছিলেন, শেক্সপীয়রের কোন লেখাটা আপনার ভালো লাগে? ঝটিকা উত্তর দিয়েছিলেন, হ্যামলেট! তারপর একটু চুপ করে থেকে বলেছিলেন, ঐ একটা বই-ই পড়েছি কিনা!

আরেকবার এক অনুষ্ঠানে এক হিন্দু পুরোহিত গীতা সম্বন্ধে বক্তব্য রাখছিলেন। সেই সভায় উপস্থিত ছিলেন মুজতবাও। দূর্ভাগ্যবশত পুরোহিত গীতা থেকে সংস্কৃত ভাষায় যে বক্তব্য দিচ্ছিলেন তাতে কিছু ভুল ছিল। মুজতবা অবশেষে দাঁড়িয়ে সমস্ত বক্তব্য মূল সংস্কৃত ভাষায় কী হবে তা মুখস্থ বলে গেলেন। দর্শকরা সব বিস্ময়ে থ!

৪। বাংলা সাহিত্যের একজন কিংবদন্তি মহানায়ক সৈয়দ মুজতবা আলী। তিনি একাধারে একজন শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক। একটা তুচ্ছ বিষয়ও তাঁর হাতে উপভোগ্য হয়ে উঠে। বক্তব্যে রয়েছে গভীর জীবনবোধ। বুদ্ধির চমৎকার ব্যবহার লক্ষণীয়। একঘেয়েমি জীবনে তার রচনা পড়লে হাসির রোল উঠতে বাধ্য। তিনি হাস্যরসের রঙিন ফুয়ারা, বাংলা রম্যরচনার প্রাণপুরুষ। তিনি একজন অমর কথাশিল্পী, ভাষাবিদ ও বাংলা সাহিত্যের রসিক কারিগর। সমকালীন বাংলা সাহিত্যে তিনি ছিলেন এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তার অগণিত পাঠকের কাছে তিনি বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল তার অনন্য ও মৌলিক রচনার জন্য। বাংলা সাহিত্যে রম্য রচনা ও ভ্রমণ কাহিনীকে তিনিই সুপ্রতিষ্ঠিত করে গেছেন। তার অনবদ্য সাহিত্য কর্মের মধ্য দিয়েই তিনি থাকবেন চির জাগ্রত, চির ভাস্বর।

৫। মুজতবার জন্ম ১৯০৪ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর, অবিভক্ত ব্রিটিশ ভারতে আসামের অন্তর্ভুক্ত সিলেটের করিমগঞ্জে। পিতা সৈয়দ সিকান্দার আলী ছিলেন একজন সাব-রেজিস্ট্রার। তার পৈতৃক নিবাস সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার জেলায়।

সিলেটের গভর্নমেন্ট হাই স্কুলে নবম শ্রেণি পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন মুজতবা। পিতার ছিল বদলির চাকরি। তাই এক বিদ্যালয় থেকে আরেক বিদ্যালয়ে তার প্রাথমিক শিক্ষাজীবন কেটে যায়। এরপর ১৯২১ সালে ভর্তি হন শান্তিনিকেতনে। বিশ্বভারতীর প্রথমদিকের শিক্ষার্থীদের মধ্যে তার নাম অগ্রগণ্য।

১৯২৬ সালে বিশ্বভারতী থেকে বি.এ. ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি পাড়ি জমান সে সময়কার ঐতিহ্যবাহী মুসলিম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিছুদিন লেখাপড়া করার পর ১৯২৯ সালে ‘হুমবল্ট’ বৃত্তি নিয়ে চলে যান জার্মানি।

১৯৩২ সালে বন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বে গবেষণার জন্য তিনি ডি.ফিল লাভ করেন । ১৯৩৪ সালে তিনি মিশরের আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। এরপর বরোদার মহারাজার আমন্ত্রণে তিনি বরোদা কলেজে তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। আট বছর অধ্যাপনা করে যোগ দেন দিল্লির শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে।

পরবর্তীতে ১৯৪৯ সালে তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানের বগুড়ার আজিজুল হক কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের খণ্ডকালীন প্রভাষকের দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া পঞ্চাশের দশকে বেশ কিছুদিন কটক ও দিল্লিতে আকাশবাণীর স্টেশন ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দে মুজতবা ফিরে অাসেন নিজের অাপন অালয়ে। পুরোনো ঠিকানা শান্তিনিকেতনে প্রত্যাবর্তন করেন তিনি। বিশ্বভারতীর ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের রিডার হিসেবে যোগ দেন। ১৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দে তিনি অবসরগ্রহণ করেন।

৬। ছাত্রজীবন থেকেই লেখালেখিতে জড়িয়ে পড়েন সৈয়দ মুজতবা আলী। শান্তিনিকেতনে অধ্যয়নকালে হস্তলিখিত বিশ্বভারতী পত্রিকায় তাঁর কয়েকটি লেখা প্রকাশিত হয়।

তিনি সত্যপীর, রায়পিথোরা, ওমর খৈয়াম, টেকচাঁদ, প্রিয়দর্শী ইত্যাদি ছদ্মনামে আনন্দবাজার, দেশ, সত্যযুগ, শনিবারের চিঠি, বসুমতী, হিন্দুস্থান স্ট্যান্ডার্ড প্রভৃতি পত্র-পত্রিকায় কলাম লিখতেন।

এছাড়া মোহাম্মদী, চতুরঙ্গ, মাতৃভূমি, কালান্তর, আল-ইসলাহ্ প্রভৃতি সাময়িক পত্রেরও তিনি নিয়মিত লেখক ছিলেন। গ্রন্থাকারে তাঁর মোট ত্রিশটি উপন্যাস, গল্প, প্রবন্ধ ও ভ্রমণকাহিনী প্রকাশিত হয়েছে।

সেগুলির মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো- দেশে-বিদেশে, জলে-ডাঙায়, উপন্যাস অবিশ্বাস্য, শবনম, পঞ্চতন্ত্র, ময়ূরকণ্ঠী এবং ছোটগল্প চাচা-কাহিনী, টুনি মেম প্রভৃতি। মুজতবা আলীর ডি.ফিল অভিসন্দর্ভটি বন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত হয়। ‘পূর্ব-পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’ তাঁর আরেকটি অনবদ্য গ্রন্থ।

আজ আমার প্রিয় মান্যবর সাহিত্যিকের জন্মদিন

সৈয়দ মুজতবা আলী, শুভ জন্মদিন

ভালো থাকবেন পরপারে……

লেখকঃ নাজমুল হাসান সজিব
আরও পড়ুনঃ
Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.