প্রবাসীদের জীবনের এক করুন প্রতিচ্ছবি

সারা দিন কাজ কর্ম শেষ করে মানুষ যখন ঘরে ফিরে আপনজনের মুখগুলো দেখেন তখন সারাদিনের পরিশ্রম, ক্লান্তি ভুলে মনে একটি খুশীর ঝলক দেখা দেয়। কিন্তু দেশ ছেড়ে যারা প্রবাস জীবন এ পাড়ি জমিয়েছেন জীবীকার তাগিদে, তাদের মনে সেই খুশীর ঝিলিক থাকে না।প্রবাস জীবন এ দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর এমনকি যুগ পেরিয়ে যায় অনেকেরই, তবুও সারাদিনের ক্লান্তিশেষে যখন বাসায় ফিরা হয়, আপনজনের সেই মায়াভরা মুখ দেখার সৌভাগ্য তাদের হয় না।

 নিজের লালন করা স্বপ্নকে পাশ কাটিয়ে পরিবারের সুখের জন্য প্রবাসীরা দিন রাত পরিশ্রম করেই যান। পরিবারের জন্য তাদের জীবন উৎসর্গ করে দেন। তবুও তারা সুখের দেখা পান না। প্রবাস জীবন এ বছরের পর বছর কাজ করতে করতে যখন তারা হাপিয়ে উটে, দেশে ফিরে পরিবারের সবার সাথে মিলেমিশে সুখী হওয়ার স্বপ্ন দেখে, তখন পরিবারের মানুষের কাছেই তারা বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।

 তাদের এত দিনের কষ্ট, পরিশ্রম, সাধনা তখন নিমিষেই শেষ হয়ে যায়। যে মানুষটি সারা জীবন যাদের জন্য এত কিছু করে যায়, শেষে সেই হয়ে যায় পর। অনেকেই পরিবার থেকে প্রাপ্য ভালবাসা না পেয়ে আবারও ফিরে যান সেই প্রবাস জীবন এ। তাদের মনের দুঃখ-কষ্ট দেখার কেউ থাকে না, শুধু প্রবাসীরাই একজন আরেকজনের কষ্ট বুজতে পারে।

অনেক কষ্ট করে বিদেশে পাড়ি দেওয়ার পর শুরু হয় একের পর এক সমস্যা। বিদেশ আসার আগে যে স্বপ্ন নিয়ে তারা বিদেশের মাটিতে পা দেয়, বাস্তবতার বেড়াজালে আস্তে আস্তে তাদের সেই স্বপ্ন ধুসর হতে থাকে। প্রথমেই তারা যে সমস্যার মুখোমুখি সেটি হচ্ছে অপরিচিত জায়গায় নিজেকে মানিয়ে নেওয়া। এর সাথে থাকার সমস্যা তো আছেই।

এগুলো যখন সে ধীরে ধীরে কাটিয়ে উটে, তখন তার সামনে এসে পড়ে পরিবারের আর্থিক অবস্থা বদলানোর দায়িত্ব। পরিবারের লোকেরাও তখন তার দিকে থাকিয়ে আশার সুতো বুনতে শুরু করে। কিন্তু তারা কেউ জানে না একজন প্রবাসী কিভাবে কত মানসিক ও শারীরিক কষ্ট সহ্য করে প্রবাস জীবন পার করছে। মা-বাবা আত্মীয়-স্বজন ছেড়ে দূর দেশে থাকা যে কত কষ্টের তা একমাত্র প্রবাসীরাই ভাল বলতে পারবে।

প্রবাসীদের জীবন নিয়ে অনেক গল্প, নাটক, উপন্যাস ইত্যাদি আমরা বিভিন্ন সময় দেখতে পাই। তেমনি আজ আমরা এক প্রবাসীর দুঃখ-কষ্টের জীবন নিয়ে আলোচনা করব। এই ঘটনা বর্তমানে অনেক প্রবাসীর প্রবাস জীবন এর প্রতিচ্ছবি হিসেবে ধরা যায়।

নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশ থেকে প্রচুর পরিমাণে তরুণ জার্মানিতে পাড়ি দিয়েছিল। রনি(ছদ্মনাম) নামের এক তরুণও ভাগ্যান্বেষণের জন্য অনেক কষ্টে জার্মানি গিয়েছিল। সুদূর জার্মানিতে গিয়ে অনেক কাটখর পুড়িয়ে সে সেখানে থাকতে শুরু করে। শুরু হয় তার নতুন জীবন সংগ্রাম। আস্তে আস্তে সে বুঝতে পারে প্রবাস জীবন কি। দেশের জন্য পরিবার আত্মীয়-স্বজনের জন্য তার হ্রদয় সর্বদা ব্যাকুল থাকত।

নতুন অবস্থায় তার কাজ পেতে অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। কাজ পাওয়ার পর সে তার উপার্জন করা টাকা বাবা-মা ভাই-বোনের জন্য দেশে পাঠাতে থাকে। এই টাকাই তার পরিবারকে বাচিয়ে রাখে। রনি পরিবারের জন্য সবসময় তার মন কাঁদত। কাজ করতে করতে সে অনেক ক্লান্ত। মা-বাবা আত্মীয়-স্বজনের কাছে ছুটে আসার জন্য তার মন সবসময় ব্যাকুল হয়ে থাকে।

সে অনেকবার দেশে আসার চেষ্টা করেছে। কিন্তু সে আসতে চাইলেও পারে না। কারন রনি চলে আসলে পরিবারে টাকা পাঠানো বন্ধ হয়ে যাবে। পরিবার অনেক আর্থিক দূরাবস্থার মধ্যে পড়ে যাবে। পরিবারের ভালোর কথা চিন্তা করে সে তার ইচ্ছাকে মুটো করে ধরে রাখে। তাইতো দেশে না এসে বিদেশে অনেক কষ্টে সে দিনযাপন করতে থাকে। পরিবারের সদস্যরাও অনেক খুশী। কারন যখন যা কিছু রনির কাছে আবদার করা হচ্ছে, সে হাজার কষ্টের বিনিময়েও তা পুরন করে দিচ্ছে। কিন্তু সে কিভাবে তাদের আবদার পুরন করছে তা কেউ জানে না।

অনেকদিন পরে রনি পরিবার-পরিজনের টানে দেশে ফিরে। দেশে ফিরেই তার প্রথম যে কথাটি শুনতে হয়, আবার কবে বিদেশ ফিরবে। এ কথা শুনার জন্য সে কখনই আশা করে নাই। শুরুতেই তার মন ভেঙ্গে যায়। তার পর একের পর এক চাওয়া রনির শুনতে হয়। চাচাতো ভাইয়ের বিদেশ যাওয়ার জন্য টাকা দেওয়া। ভাইয়ের পড়াশোনার খরচ, নতুন বাইক কিনার টাকা দেওয়া। বোনের ভাল জায়গায় বিয়ে দেবার জন্য যৌতুক তৈরি রাখা। সাথে বাবা-মায়ের চিকিৎসার খরচতো লেগেই থাকে। আত্মীয়-স্বজন যারা আর্থিক ভাবে অনগ্রসর, তাদেরকেও রনির খেয়াল রাখতে হয়। সে কিভাবে এত সবকিছু সামলাবে, সেটি কেউ চিন্তা করে না।

বন্ধুবান্ধবরাও তাকে অকারনে টাকা খরচ করায়। সবার কাছে সে যেন এক টাকাওয়ালা বৃক্ষ। ঝাকি দিলেই টাকা পড়বে শুধু। আসলে কেউ তাকে বুঝতে চায় না। সে কি চায় সেটাই তারা জানতে চায় না। সবাই শুধু তার কাছে টাকাই চায়। এটিই যেন সবার একমাত্র কামনা।

রনি দেশে এসেছিল অনেক পরিকল্পনা নিয়ে। পরিবারের সবাইকে নিয়ে সে সুখে জীবন পার করতে। বিয়ে করে নিজের সংসার গড়তে চেয়েছিল। কিন্তু কেউ তার দিকে লক্ষ করেনি। সে আজ অনেক ক্লান্ত। প্রবাস জীবন এর সব দুঃখ কষ্ট তার একা বয়ে বেড়াতে হয় পরিবারের সুখের জন্য।

রনির ঘটনা প্রবাসীদের জীবনের এক প্রতিচ্ছবি। প্রবাসীরা প্রতিনিয়ত অক্লান্ত পরিশ্রম করেই যাচ্ছে পরিবারের মুখে একটু হাসি ফুটানোর জন্য। এভাবে তারা তাদের আশা, ভরসা, শখকে পাশ কাটিয়ে প্রতিদিন পরিবারের জন্য লড়ে যাচ্ছে।

Facebook Comments