দূর প্রবাসে ক্লান্ত শরীরেও তন্দ্রা হয়, ঘুম আসে না

নিরাপদ কর্মসংস্থান ও উন্নত জীবনের আশায় লাখো তরুণ প্রতিবছর পারি  জমাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের মরুর দেশ গুলোতে।মাথার ঘাম পায়ে ফেলে এই তরুণেরা আমাদের দিচ্ছেন রেমিটেন্স যা আমাদের অর্থনীতির একটি প্রধান আয় উৎসকিন্তু মরুর দেশে সেই তরুণেরা কেমন  আছেন?  আমাদের সাথে নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা শেয়ার করছেন  কাতার থেকে সুজন আহমেদ। 

উচু উঁচু দালান, ঝক ঝকে রাস্তাঘাট, পরিছন্ন সমুদ্র সৈকত, গাছপালা এবং চোখ ধাধানো সৌন্দর্য মন্ডিত মধ্যপ্রাচ্যের দেশ গুলো। উন্নত জীবন ও নিরাপদ কর্মসংস্থানের স্বপ্ন নিয়ে বাংলাদেশের লাখো লাখো যুবক ভিটে মাটি,মায়ের গয়না গাটি ,গবাদি পশু ও ফসলি জমি বিক্রি করে অথবা লোন-ধারদেনা করে ছুটে আসছে এই মরুর দেশে। ভাগ্য উন্ননয়ে পরবাসী হয় অজানা পথের।

এই পরিনামহীন যাত্রাটা অনেকটা এমনই হয়,  বাংলাদেশ এয়ারপোর্ট এ যেন দুর্গম গীরি, প্রান্তর মরুর দুস্তর পারাপার, ইকোনমিক ক্লাসের লাইনে ঘন্টার পর ঘন্টা, ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা রাতের ঘুম দুপুরে শেষ করে চোখ তুলে যখন ডাকেন ” আপনার সিরিয়াল এখন।” তখন মনে একটা স্বস্থির নিঃশ্বাস ফেলে।” যাক বাচলাম” । এবার দুই ডানায় ভর করে পাখি উড়ে যাবে অজানায়। ভ্রমণ ক্লান্তি, খুদা ও নিদ্রাহীন চোখ মেলে যখন দেখা যায় ভিনদেশী ইমিগ্রেশন কর্মকর্তার সৌহার্দপূর্ণ আচরণ তাৎক্ষণিক মনের ভিতর পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।

সরিকা কোম্পানী

দেশ থেকে আসার আগে প্রাইভেট এজেন্সি কন্টাক্ট পেপারে সাক্ষর করায় এক রকম বেতন, পরর্বতীতে এখানে এসে হয়তো দেখলেন বেতন ৫০% কম। এই গোলক ধাঁধার হোতা সরিকা কোম্পানী আর দালালের প্রহসন। নির্দিষ্ট কাজের উপর কন্ট্রাক্ট নিয়ে কর্মীদের বেতনের অংশীদার হওয়াই সরিকা কম্পানীর মর্মার্থ। । এই অসঙ্গতি মেনে নিতে না পারলেও আপনার ফিরে আসার রাস্তা বন্ধ। পিছনে সব খুইয়ে এই প্রবাসে আপনি, এখান থেকে ফিরে কোথায় যাবেন?

থাকা -খাওয়া

কন্টাক্ট অনুযায়ী থাকা কোম্পানির খাওয়া নিজের। ৮ ফুট দৈর্ঘ্য ৩ ফুট প্রস্ত, রড এবং ষ্টিল দিয়ে একটি ২ তলা বিশিষ্ট খাট যেখানে দুই জন মানুষ ঘুমানোর জন্য ব্যাবস্থা করা হয়েছে। একই রুমে ৭ টি খাট রয়েছে যেখানে ১৭ জন শ্রমিক ঘুমাতে পারে। বাথরুম রয়েছে প্রতি তিন রুমের জন্য একটি করে এবং কিচেন একটি এ যেন শরণার্থী শিবির।

দেশে থাকতে নুন ভাত হোক আর ডাল ভাত হোক, মায়ের হাতের রান্না টেবিলে বাড়া থাকতো সেই আপনি হয়তো এখন রান্নার সকল সরঞ্জাম কিনে লেগে গেলেন রান্না শিল্প হস্থগত করতে। যদিও বহু কষ্টে রান্না শিখে নিলেন কিন্তু সীমিত সময়ে দ্রুত রান্নার কৌশল আপনাকে সিস্টেম শিখতে বাধ্য করবে। পেটের দ্বায়ে সে খাবার মুখ রোচক হউক আর না হউক এই খেয়ে কাজ করতে হবে সেরা মানের।

রুম মেইট বিবিধ সমস্যা

আমরা এক জাতি একই বর্ণের থাকা সত্তেয় কেউই কারো পারিবারিক সামাজিক মানুষিক অবস্থা বুঝি না, একটি মানুষ নতুন যখন প্রবাসে আসে, তাঁকে নিয়ে অনেকেই ট্রল করে মুরগী কিংবা আবুল বানানোর চেষ্টায় থাকে। ভালো মানুষের মূখ মুখোশের পার্থক্য টিক তখনই বুঝা যায়, সারা রাত কাজ করে রুমের ভিতরে এসে প্রশান্তির ঘুম কি আর আসে যখন রুমে এসে দেখবেন রুম মেইটদের ফোন আলাপ ও উচ্চতর কথা বার্তা।

বিশুদ্ধ পানির অভাব

আরবের পানি হলো লবণাক্ত, সে ক্ষেত্রে রিফাইন করা পানির প্রয়োজন সবার এই যায়গায় ও সমস্যা, যেহেতু সাপ্লাই কোম্পানীর কাজ সেহেতু কোম্পানী চায় ব্যাবসা। শ্রমিক বাচুক বা মরুক সেটা তাদের দেখার বিষয় নয় তাদের প্রয়োজন কাজ আর কাজ, নিয়মিত বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করতে হিমসিম খায় কোম্পানি। উচ্চ পদে থাকা অনেক কর্মকর্তারা ও অনেক সময় অনেক সুবিধা থেকে শ্রমিকদের কে বঞ্চিত করেন।

১২ ঘন্টা কাজ ও যাতায়াত

  কন্টাক্ট অনুযায়ী ১২ ঘন্টা কাজ, কাজের সাইডে যেতে সময় লাগে, যাওয়া আসা ২ ঘন্টা অর্থাৎ সর্বমোট ১৪ ঘন্টা অনেক সময় কোম্পানির গাড়ির অপেক্ষা করতে করতে এমন হয় যে অপেক্ষা না করলে পায়ে হেটে চলে যেতে হয়। কাজ এবং যাতায়াত ১৪ ঘন্টা ১ ঘন্টা রান্না ১ঘন্টা বাড়িতে ফোন আলাপ ১৬ ঘন্টার পর তন্দ্রা আসে তবে প্রসান্তির নয়, আবার উঠতে হবে কাজে যাওয়ার নির্দিষ্ট সময়ের ১ ঘন্টা পূর্বে।

মায়ের ভাষায় কথা বলার কেউ পাশে নাই

এই যায়গায় অনেক ভাষার অনেক সংস্কৃতির অনেক মত আদর্শের মানুষ একেক জনের ভাষা একেক করম যদিও আন্তর্জাতিক ভাষা ইংরেজিতে কথা হয় কর্মক্ষেত্রে, সবার সাথে মায়ের ভাষায় কথা বলার কষ্ট এক মাত্র প্রবাসীরাই বুঝে।

বেতন ভাতায় অনিয়ম :

মাসের ৩০ দিন কাজ করে যখন বেতন আসার সময় হয় অনেক আনন্দে অধিকাংশ শ্রমিকেরা অপেক্ষার প্রহর গুনে কিন্তু সময় মত বেতন আসে না, দেখা যায় কোন কোন সাপ্লাই কোম্পানিতে তিন মাস চার মাস অবধি বেতনের কোন খবর পাওয়া যায় না, শুধু খাবারের টাকা দিয়ে কোন রকম বেচে থাকে শ্রমিকেরা।

২ বছর পরে ছুটি ও লিপ সেলারী দেওয়ার কথা থাকলেও সময় আসলে গড়িমসি করে কোম্পানি, আবার সব সাপ্লাই যে এই তাও না, তবে সিংহভাগ সাপ্লাইয়ে এই রকম অনিয়ম চলতেছে।

তন্দ্রা হয় , ঘুম আসে না

মানুষ অভ্যাসের দাস। আধ পেটা খেয়ে ১৬ ঘন্টা কাজ এক সময় শরীরে সয়ে যায়। কিন্তু মাস শেষ যখন বেতনের ৫০-৬০% হাতে আসে যাতে না নিজের ভালো করে থাকা যায়, না দেশে পরিবারের চাহিদা মিটে। এই পারিশ্রমিকে দূর ভবিষ্যতেও সঞ্চয়ের সম্ভাবনা শূন্য এমনকি দেশে ফিরে যাওয়ার পথ খরচ জামানোটাও অসম্ভব। তখন মনে হয় মরুর ফাঁদে আটকে গেছি আমরা। এই ফাঁদে ১৬ ঘন্টা পরিশ্রমে শরীর ক্লান্ত হয়, কিন্তু ঘুম আসে না, মাঝে মাঝে তন্দ্রা হয়।

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.