জীবন-তরী, সিলেট থেকে প্যারিস।

পকেটে বিশ ইউরো কাঁচা আরো এক ইউরো নিয়ে এথেন্সের বিমানবন্দরে এসেছি ভোর চার টায়। গন্তব্য প্যারিস, এর আগেও চার বার এসেছিলাম। ফ্লাইট হয়নি। এবারো এসেছি মনে মনে একটু পরেই বাসায় ফিরবো।

সেজন্য সংগে টাকা নেইনি বেশ, বাসায় ফিরতে মাত্র ১০ ইউরো লাগে। কিন্তু না, বিমানে উঠে-ই গেলাম। শক্ত করে হাতে চিমটি দিলাম, স্বপ্ন নাকি বাস্তবতা উপলব্ধির জন্য। গ্রিসের এথেন্সটা কেমন আনন্দ কিংবা বেদনার? ওখানকার কয়েদি খানায় যারা ছিলো তারা ছাড়া কেউ বুঝবেনা।

আমার বড় ভাইকে বললাম ব্রাসেলসে যাচ্ছি। আনন্দ আর আনন্দ আমার চারপাশে। বহনকারী বিমানটার নাম ছিলো রায়ান এয়ারলাইন্স। ঐ বিমানটার প্রতি দূর্বলতা ছিলো বেশ আগের। রায়ানে চাকরী করে আমার সবচে প্রিয় বন্ধু।

সিটে বসেই চিকেন বার্গার অর্ডার দিলাম। পেটে ভুমিকম্পন চলছে। ইচ্ছে বার্গার খেয়ে কফি আরো এনতেন খাবো! মাগ্না খেতে কে-না পছন্দ করে। কিন্তু না- খাবার নেয়ার আগেই পেসিঞ্জারদের কাছ থেকে টাকা পেইড করতে দেখে বুঝতে বাকি রইলানা খাওয়া আর হচ্ছে না আমার। পেটে হাত দিয়েই বিমান বালাকে পেইন পেইন করে টয়লেটে চলে গেলাম। পেইনের উদ্দেশ্য অর্ডাল কেন্সেল করা। পরে লজ্জা থেকে বাচাঁর জন্য একটা কফি নিলাম তিন ইউরো দিয়ে।
বেলজিয়ামের আকাশে যখন বিমান, তর সইছিলো না কখন মাটিতে নামবে! নামার পর জানলাম বিমানবন্ধরটা ব্রাসেলস না, শহর থেকে দূরে। বাস কাউন্টারে দাড়ালাম টিকেটের জন্য। হাত-পা কাপছে, না-জানি টিকিটের দাম কত?

জানি অনেকে বিশ্বাস করতেও চাইবেন-না, টিকিটের দাম মাত্র ১৮ ইউরো। আমার কাছেও তাই ছিলো। সবকিছু যেন কাকতালীয়। বেলজিক এক কাপলের কাছে ফোন চাইলাম। ফোন করলাম ভাইয়ের কাছে, তিনি নাম্বার দিলেন রিপন নামের কেউ একজনের।

উনাকে ফোন করলাম। ট্রেন স্টেশন থেকে এবং বললাম একটু পর থেকেই আমার কাছে ফোন থাকবেনা, শার্টের কালার এই আর আমি মানুষটা কালো মুখ ভর্তি দাড়ি। রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকবো। তিনি আসলেন এবং এক জন আরেক জনকে চিনতে সমস্যা হলোনা। এর আগে উনাকে আমি কখনো দেখিনি।

বাসায় নিয়ে যাওয়ার আগে গো-মাংশ কিনলেন, সিম এবং তাতে টাকাও ডুকিয়ে দিলেন। তিনি রান্না করতে করতে আমি একটা ঘুম দিলাম। খেয়ে দেয়ে প্যারিসের দিকে রওয়ানার জন্য গাড়িতে তুলে দিলেন। টাকা দিতে চাইলেন একশ ইউরো। ভাড়া মাত্র ত্রিশ ইউরো তাই আমি পঞ্চাশের চাইতে বেশি নিলাম না।

বর্ডারে দাঁড়িয়ে থাকা প্যারিসের গুন্ডারা আমাকে গ্রহণ না করে ফিরিয়ে দিলো বেলজিয়ামের গুণ্ডাদের হাতে (পুলিশ)। ১২১ দিনের একটা সফর করলাম বেলজিয়ামের কারাগারে। জেলের ভিতরকার গল্প অন্যদিনের জন্য রেখে দিলাম।

সেখানে প্রতিদিন অপেক্ষায় থাকতাম এই বুঝি ঢাকার টিকিট ধরিয়ে দেবে আমার হাতে। দেয়ার কথাও ছিলো। দেশে পাঠাতে এম্বেসি পর্যন্ত নিয়েছিলো আমায়। এর চেয়ে বেশি নেননি আল্লাহ।

বেলজিয়াম এম্বেসির দায়িত্বে থাকা এম্বেসেডোর ভদ্রলোকের মাঝে ডিপ্লোম্যাটিক কথা বার্তার কিছুই পেলাম না। তিনি আমার বারটা বাজাতে প্রচুর সহায়তা করেছিলেন বেলজিক ডিপ্লোম্যাটকে।

ফ্রান্স থেকে ঢাকা টু বেলজিয়ামের মূল কূটনীতিক কাজকর্ম সারেন আমার ভাই (মিজান)। আর এভাবেই অল্পের জন্য বাঁচিয়ে রাখেন আল্লাহ। জেলে থাকতে তিন জন মানুষের সাথে মাঝেমধ্যে ফোনে কথা হতো। ভাই, জহিরুল, আর রিপন ভাই।

ফোন দিয়ে রিপন ভাই বলতেন অয় মাহবুব, ‘চিন্তা করিওনা। আমরা চেষ্টাত আছি।’ মায়া মায়া কন্ঠে আরো কত পরামর্শ দিতেন। এগুলো বোঝাবার আর বলবার নয়। ওখান থেকেই রিপন ভাইয়ের প্রতি প্রেম-ভালোবাসার জন্ম নেয় আমার হৃদয়ে।

ভাই আরো বলতেন ‘বাড়ির তল থেকে দেশে গেলে হয় নাকি মাহবুব। তোমার ভাইর কাছে কিলা মুখ দেখাইতাম আমি।’ চারটি মাস বাংলায় কথা না বলে সঙ্গে বাংলা খাবার ছাড়া বেঁচে থাকার কষ্ট ফাঁসির চাইতেও বেশি মনে হয়েছিলো।

ঈদের দিন আমার বন্ধু মোহন ফোন দিয়েছিলো আর আমি একদিন খালেদ আমার ছোট ভাই তার ম্যাসেঞ্জারে কথা বলেছিলাম সংগে আম্মা। আসলে কথা বলা হয়নি শুধু কান্না আর কান্না। হয়তো আরো অনেকে ফোন দিতেন। কিন্তু নাম্বার কাউকে দেয়া হয়নি বিশেষ কারনে।

জেল থেকেই জানলাম বাংলায় কথা বলা কি যে আনন্দের। গল্প লম্বা হয়ে যাচ্ছে। একশ একুশ নাম্বার দিনে মুক্তি পেলাম। তখন আনন্দ করার মত শক্তি ছিলোনা গায়ে আর মনে। আবারও রিসিভ করলেন রিপন ভাই। আবারও একি আপ্প্যায়ন। উনার বেডে এক রাত কাটালাম। পরদিন প্যারিস থেকে বেলজিয়াম গিয়ে সংগে করে নিয়ে এলেন ভাই প্যারিসে। 
কিন্তু আজ-ও প্যারিস গ্রহণ করেনি আমায়। হয়তো কোন একদিন করাবেন প্যারিস এর মালিক আল্লাহ। আশায় রইলাম।

লেখকঃ মুহাম্মদ রেহমান মাহবুব
আরও পড়ুনঃ দূর প্রবাসে ক্লান্ত শরীরেও তন্দ্রা হয়, ঘুম আসে না
প্রবাসীদের জীবনের এক করুন প্রতিচ্ছবি
আমেরিকা গিয়ে আত্মোপলব্ধি!
Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.