আমেরিকা গিয়ে আত্মোপলব্ধি!

নিজের সবুজ পাসপোর্টে আমেরিকার ভিসাটা দেখে রোমেনা বেগমের বিশ্বাস হয়না তিনি সত্যি সত্যি আমেরিকা যাচ্ছেন। বারবার ভিসার কাগজে হাত বোলান আর মনে হয় আজ থেকে পাড়ায় ওনার দাম আরো কতোটাই না বেড়ে গেল।

তাছাড়া বড় ছেলে রাজীবকে সামনাসামনি দেখেননা প্রায় দশ বছর হলো। বাবার মৃত্যুতেও ছেলেটা আসতে পারেনি হাতে টাকা না থাকায়। বড় অংকের টাকা চলে যায় বাবার চিকিৎসায়। ছেলেকে মাস কয়েক আগে বলেছিলেন আমেরিকা যেতে চান একবার। কেমন দেশ, কি বিষয় একটু নিজের চোখে দেখার ইচ্ছে আর কি। ছেলে যে ছয় মাসের মধ্যে যাবার ব্যবস্থা করবে সেটা উনি নিজেও ভাবেননি। ‘বড় ভালো পোলা আমার রাজীবটা’ বলে রোমেনা বেগম আরো একবার নিজের ভিসায় হাত বুলিয়ে নেন।

বাড়ির পথে যেতে যেতে মনে মনে গুছিয়ে নিতে থাকেন কি কি কেনাকাটা করতে হবে। দুমাসের জন্য যাবেন। ঘরে পরার বাইরে পরার শাড়ী, শীতের কাপড়, ছেলের জন্য জিনিসপত্র বিশাল যোগাড়যন্ত্রের ব্যাপার বলে কথা। আড়ং থেকেই সবকিছু কিনতে হবে মনে মনে ঠিক করে নেন।

রোমেনা বেগম আমেরিকা আসার যোগাড়যন্ত্র করতে থাকুক, আমরা এই ফাঁকে একটু আমেরিকার নিউইয়র্ক শহরে রাজীবের অবস্থান দেখে আসি….

………………

মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেয়া রাজীব খুব ছোটবেলায় বুঝে গিয়েছিল বাড়ির বড় ছেলেদের ঘাড়ে অনেক দায়িত্ব। আর তাই পড়াশোনায় মোটামুটি হলেও কঠোর পরিশ্রম আর অধ্যবসায় তাকে ক্লাসের ভালো ছাত্রদের কাতারেই রেখেছিল। এসএসসি এইচএসসি তে ভালো ফলাফল আর পরবর্তীতে সুযোগ মেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার। অনার্সের প্রথম বর্ষে থাকাকালীন বন্ধুদের সবার সাথে মিলে ডিভি লটারীর ফর্ম পূরণ করে। জানা ছিলনা এতো মানুষের মাঝে যে ভাগ্যের শিকে শুধু তারই ছিঁড়বে।

বিদেশ মানেই অফুরন্ত টাকা আয় আর সম্ভাবনার নতুন নতুন দ্বার, এরকমই ভাবে আমাদের দেশের বেশীর ভাগ লোকে। আর আমেরিকা যাওয়ার সুযোগ পেয়েও সেটা ছেড়ে দেয়ার বোকামীতো নিতান্ত পাগলেও করেনা। আর তাই এতো অল্প বয়সে একা বিদেশ যেয়ে কতোটা কি করতে পারবে তার ভাবনার চেয়েও পারিপার্শ্বিকতার চাপেই রাজীবকে ভুলে যেতে হয় বাকী সবকিছু।

সাধ আর সাধ্যের মেলবন্ধন মধ্যবিত্তের জীবনে হয়না বললেই চলে। তবে এদের মধ্যে যদি একজন কেউ হুট করে সামনে এগিয়ে যায় খানিক, সংসারের ভারী বোঝাখানা অবলীলায় তার ঘাড়ে এসে পরে।

আর সেই ভারী জোয়ালখানা টানতে গিয়ে সবচেয়ে অসহায় অবস্থায় পরে সেই এগিয়ে যাওয়া মানুষটি। রাজীব যেন তার জ্বলন্ত উদাহরণ। বিদেশ মানেই অফুরন্ত টাকা কথাটি কিন্তু মিথ্যে নয়।

তবে তা আয় করতে যে অপরিসীম কষ্ট করতে হয় তা ভুক্তভোগী ছাড়া আর কেউই জানেনা। বাবা মায়ের জমানো সব টাকা, ধার দেনা আর মায়ের গহনা বিক্রি করে টিকেট কেটে আমেরিকায় আসা রাজীবের বেশ কয়েক মাস লেগে যায় শুধু দুনিয়াদারী বুঝে নিতেই।

সারাদিন বাঙ্গালী দোকানে কামলা দিয়ে, বিকেলে নাকে মুখে কিছু গুঁজে কয়েক ঘন্টা ঘুম তাও বেসমেন্টে শেয়ার বিছানায় তারপর রাত দশটা না বাজতেই দৌড়ে যেয়ে পেট্রোল স্টেশনে কাজ শুরু করা সকাল সাতটা পর্যন্ত।

এ যেন এক অমানুষের জীবন, যার শুরু আছে কিন্তু শেষ নেই। সপ্তাহে পাওয়া একদিন ছুটিতে গাড়ি চালাতে শেখা, পাশাপাশি নিজের পড়াশোনা করার চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া। হাজার হোক দিনশেষে মানুষের শরীর তো।

কতটা নিতে পারে বা কতদিকেই বা সময় দেয়া সম্ভব? আর তাই পড়াশোনাটা শিকেয় উঠে যায় আর কাজটাই হয়ে ওঠে মুখ্য। দেশে করে আসা দেনা শোধ পাশাপাশি দেশের মানুষগুলোর একটু ভালো থাকবার ব্যবস্থা করে দেয়ার জন্য রোজগারের সিংহভাগ চলে যায় দেশে। নিজের জন্য জমেনা কিছুই।

দিনে দিনে আশপাশ বুঝে নেয়ার পাশাপাশি ড্রাইভিংটা বেশ ভালোই রপ্ত করে নেয় রাজীব। আর বছরখানেকের মাথায় বাকী সব কাজ ছেড়ে পুরোপুরি ক্যাবচালক বনে যায়। বছর পাঁচেক আগে যখন ওর বাবা অসুস্থ হয় খুব ভেবেছিল এবার একটু দেশে যাবে।

কিন্তু চিকিৎসা খরচের অংকের কথা শুনে নিজেকে সামলে নেয়। বরং সেই টাকা দিয়ে চিকিৎসা যদি ভালো চলে তাই নিজের অনুভূতিগুলো বাক্স বন্দী করে আরো বেশী কাজে মনোযোগী হয়।

মাকে রাজীবের বেশ গোছানো হিসেবী আর সংসারী মনে হয়। বাবা যতদিন বেঁচে ছিলেন বাবার কাছেই টাকা পাঠাতো রাজীব কিন্তু হিসেব চাইতে লজ্জা লাগতো বলে কখনোই সংসার খরচের হিসেবও জিজ্ঞেস করা হয়নি। কিন্তু গত পাঁচ বছরে মায়ের একাউন্টে টাকা পাঠায় সে।

মায়ের কাছে শুনেছে তারা দোতলা বাড়ি করেছে। একমাত্র বোন, মেঝোভাই সজীবের বিয়ে দিয়েছেন। রাজীবের খুব বলতে ইচ্ছে করে আমিতো বড় আমার বিয়ে না দিয়ে কেন সজীবের বিয়ে? নিজের বিয়ের কথা কিভাবে মুখ ফুঁটে বলে তাই আর বলা হয়না বরং ভেবে নেয় সে কবে না কবে দেশে যাবে তার জন্য সবাইকে বসিয়ে রাখাই যে বোকামী।

কয়েক মাস আগে রাজীবের মা খুব আবদার করে বলেছে আমেরিকা আসতে চায়। দীর্ঘদিন পরিবারের আদর মায়াবর্জিত রাজীবের মন নিমিষেই চঞ্চল হয়। কিন্তু ব্যাচেলর শেয়ার বাসায় মাকে এনে কিভাবে ওঠায়? তাই কাগজ গোছানোর বাহানায় আদতে নিজের সংসার গোছায় দুইমাসের জন্য।

তার সাথে শেয়ারে থাকা মানুষটিকে অনুরোধ করে দুমাস অন্যত্র ব্যবস্থা করে নিতে। মায়ের ভিসা হয়ে গেছে। এখন অপেক্ষা মায়ের সাথে কয়েকটা দিন একসাথে কাটানোর, দীর্ঘ দশ বছর পর।

………………….

গত কয়েক বছর যাবত রোমেনা বেগমের বাসার কেউই ব্র্যান্ডের জিনিস ছাড়া ব্যবহার করেননা। ঘরে সব দামী আসবাব থাকা সত্ত্বেও প্রায়ই এটা ওটা পাল্টাতে হয়। হাজার হোক সমাজে একটা স্ট্যাটাস রাখার ব্যাপার আছে না? ছেলে সজীবের বন্ধুর শোরুম থেকে গাড়ি কেনা হয়েছিল বেশ কম কিস্তিতে।

এখন হঠাৎ করেই ছেলের বন্ধু টাকা চেয়ে বসেছে। রাজীবের সাথে সামনাসামনি কথা বলবেন বলে ভেবে রেখেছেন রোমেনা বেগম। আমেরিকা যাওয়া উপলক্ষ্যে আড়ং, ভাসাবি থেকে শাড়ি কেনা হয়েছে। রাজীবের জন্য দামী পাঞ্জাবি ছাড়া আর কি নেবেন বুঝতে না পেরে কিছুই আর কেনা হয়না। বাকী ছেলেমেয়েরা বোঝায় আমেরিকাতেই তো সব ব্র্যান্ডের দোকান আছে বাড়তি কিছু নেয়া মানে ওজন বাড়ানো।

বিদেশে থাকা মানুষেরা স্বপ্নের জীবন কাটায়, এমন ধারনা করা মানুষেরা যখন বাস্তবতার মুখোমুখি হয় তখন দুঃখ, ক্ষোভ, হতাশার সমন্বয়ে তাদের মনের যে ভাব হয় তা বোঝানোর মতো কোন শব্দ বোধহয় অভিধানে নেই।

রোমেনা বেগমের এখন সে অবস্থা। নিউইয়র্ক শহরের আলো ঝলমলে রাত ওনার মনকে যতটা পুলকিত করে সেটা মিইয়ে যায় শহরতলী থেকে বেশ দূরে থাকা ছেলের এক কামরার বাসস্থান দেখে। ওনার নিজের বেডরুমই যে এরচেয়ে বড়।

ছেলে আদতে কি করে সে প্রসঙ্গ সবসময় এড়িয়ে গেলেও এখানে এসে ছেলের কাজ, জীবন চালানোর সংগ্রাম আর অমানুষিক পরিশ্রমের উপাখ্যান যেন রোমেনা বেগমকে প্রতিনিয়ত আত্মদহনে পুড়িয়ে দিতে থাকে। দেশের মানুষগুলোকে ভালো রাখতে গিয়ে নিজের সবকিছু বিকিয়ে খেটে যাওয়া নিজের ছেলের কাছেই যেন ছোট হয়ে যান প্রতিনিয়ত।

ছেলে অনেক কিছু কিনে দিতে চাইলেও রোমেনা বেগম কিছুই কিনতে দেননা ছেলেকে। রান্না আর ঘরের কাজ করে, দুমাস প্রানপনে চেষ্টা করেন ছেলের জন্য কিছু করতে। যেন দশ বছরের তিলে তিলে জমা, খানিক ঋণ শোধের চেষ্টা।

দেশে ফেরার পথে রাজীবকে শুধু বলতে পারেন, ‘ বাবারে মায়ের কাছে কেন লুকাইছিস তোর এই কষ্টের জীবনের কথা। তোর কাছে না আসলে আমার যে কোনদিন জানা হইতোনা এতো পরিশ্রমী কিন্তু বিনয়ী একটা ছেলে আল্লাহ আমারে দিসে। মা তোর সৎ পরিশ্রমের যথাযথ মূল্য যে দিতে পারি নাই রে। আমাকে তুই মাফ করে দিস। নিজের খেয়াল রাখিস। এখন থেকে আমি না বললে কোন টাকা পাঠানোর দরকার নাই।’

…………….

দেশে ফেরার পরদিনই রোমেনা বেগমের বাসা আত্মীয় পরিজনে ভরে যায়। সবাই রোমেনা বেগমের সাথে দেখা করতে এসেছেন সাথে কি গিফট আনা হয়েছে তাও একটু দেখে নেয়ার চেষ্টা সবার মধ্যেই।

মা, তাড়াতাড়ি স্যুটকেস খোলো না। কি কি এনেছো দেখি?

– আমি কিছুই আনিনি।

মানে কি? ভাইয়া কিছু কিনে দেয়নি? খালি হাতে কিভাবে তোমাকে দেশে পাঠালো? আশ্চর্য্য।

– আমি যে আমেরিকা গেলাম, আসলাম তোরা কে আমাকে কি দিয়েছিস? টিকিটের টাকা বাদই দিলাম, আমার হাতখরচের জন্যও কি দুটো পয়সা কেউ দিয়েছিস? সজীব শোন গাড়ির বাকী টাকা তুই পারলে দিবি নয়তো গাড়ি বেঁচে দে।

এতোদিন ধরে শুধু পেয়ে আসা রোমেনা বেগমের বাকী ছেলেমেয়েরা মায়ের এহেন রূপে মনে মনে বড়ভাইকে দোষারোপ করলেও রোমেনা বেগমের সামনে কিছু বলার সাহস করেনা আর। উপহার প্রাপ্তির আশায় জড়ো হওয়া সবাই আরো কিছুদিন থাকার ইচ্ছে থাকলেও একটু তড়িঘড়িই বিদায় নেয় এইবার।

……………..

রোমেনা বেগম খুব বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করেন তার এহেন পরিবর্তনের কারণ অনুসন্ধানের চেষ্টা তার কোন ছেলেমেয়েই করেনা। বরং যে যার মতো কেটে যাওয়ার চেষ্টাই করে যেন কোনভাবেই রোমেনা বেগমের কোন দায়িত্ব তাদের ঘাড়ে এসে না পরে। ব্যতিক্রম শুধু রাজীব, যে কি না মা না চাইলেও তার খরচটুকু ঠিক ঠিক পাঠিয়ে দিতে কোন কালক্ষেপন করেনা।

জীবনের এতোগুলো বছর পেরিয়ে রোমেনা বেগম বুঝতে পারেন তার মাতৃত্বের আচরণ কতোটা একপেশে ছিল। বুঝতে পারেন ছেলেমেয়েদের আসলে অভাব শব্দটাকে বুঝতে দিতে হয়, প্রয়োজন আর সাধ্যের মেলবন্ধন শেখাতে হয়, চাইলেই কিছু না দিয়ে সে তার যোগ্য কিনা সেটার আগে প্রমান দেয়া শেখাতে হয়, সর্বোপরী বুঝতে দিতে হয় সংসারের দায়িত্ব পরিবারের সবার। শুধু একজনের আয়ের দিকে তাকিয়ে থেকে তাকে দিন দিন খাদের কিনারে না ঠেলে দিয়ে একে অপরের হাত ধরেই কেবল পরিবার নামক সম্পর্ককে টেনে নিয়ে যেতে হয়।

ধন্যবাদঃ  ডাঃ জান্নাতুল_ফেরদৌস

আরও পড়ুনঃ প্রবাসীদের জীবনের এক করুন প্রতিচ্ছবি

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.