১০ বছর বয়সী কনিষ্ট ভাষাশহীদ অহিউল্লাহ

“মোদের গর্ব মোদের আশা,

আ মরি বাংলা ভাষা!”      

অতুলপ্রসাদ সেনের বিখ্যাত এই কবিতাটি পড়লেই ঐতিহ্যবাহী ভাষা আন্দোলনের কথাটি মনে পড়ে যায়। ভাষা আন্দোলন কথাটি মাত্র দুটি শব্দের হলেও মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারিতে যে আন্দোলন হয় তা বিশ্বের ইতিহাসে বিরল একটি ঘটনা।

বায়ান্নোর ভাষা আন্দোলনের সময় কিশোর অহিউল্লাহ এর বয়স ছিলো মাত্র দশ বছর বা তারও কম। বিভিন্ন তথ্যসূত্র থেকে জানা যায় শিশুটির বাসা ছিলো নবাবপুর রোডের কাছে ‘১৫২ লুৎফর রহমান লেন ‘এ। তাঁর বাবা ছিলেন একজন রাজমিস্ত্রি। বাবার নাম হাবিবুর রহমান।

ছোট্ট এই ১০বছর বয়সের কিশোরটি হয়তো তখন বুঝতোইনা ভাষা আন্দোলন কি এবং কেন হচ্ছিল? অথচ ১৯৫২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারিতে প্রখর আন্দোলনের মাঝে পুলিশের গুলিবর্ষণে শহীদ হন অহিউল্লাহ।তিনি তখন নবাবপুর রোডের পাশে ‘খোশমহল’ রেস্টুরেন্টের সামনে দাঁড়িয়ে কাগজ চিবোচ্ছিলেন।

নবাবপুর রোডে জনতার ঢল দেখে কৌতূহলবশত হয়তোবা দেখতে এসেছিলেন সেখানে। তখনই একটি গুলি তার মাথায় এসে পড়ার সাথে সাথেই মারা যান তিনি। এরপর অহিউল্লাহের লাশ নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজে।খবর পেয়ে তার বাবা-মা কাদঁতে কাদঁতে ছোটে এসে ছেলের লাশ নিয়ে দাফন করতে চাইলে হাসপাতালে থাকা কর্তব্যরত পুলিশরা নানা বাহানা দেখিয়ে তাদের বাড়ি পাঠিয়ে দেয়।

এরপরেই অহিউল্লাহের লাশ গুম করে ফেললো। তবে অহিউল্লাহের পকেটে তার নিজের আঁকা একটি রঙিন কগজে বিভিন্ন জীবজন্তু আর প্রজাপতির ছবি পাওয়া গিয়েছিল। ২০০৬ সালে ভাষা আন্দোলন গবেষণাকেন্দ্র ও জাদুঘর থেকে ভাষাশহীদ অহিউল্লাহ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ এবং ছবি আকার প্রথম উদ্যোগ নেওয়া হয়।

প্রত্যক্ষদর্শী বিভিন্ন লোকের কাছ থেকে অহিউল্লাহের শারীরিক বিবরণ নিয়ে ২০০৭ সালে শ্যামল বিশ্বাস শহীদ অহিউল্লাহের একটি ছবি আঁকেন। এই ছবিটিই ভাষা শহীদ অহিউল্লাহের একমাত্র স্মৃতিচিহ্ন।কিন্তু এখন পর্যন্ত তাকে ভাষা শহীদ হিসেবে যথার্থ স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি।

এছাড়াও আরও অনেক শহীদদের নাম ও পরিচয় অজানাই থেকে গেছে এখনো। শহীদদের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়ে ২১ফেব্রুয়ারি বাংলার একটি শোক দিবস হিসেবে পালিত হতো। পরবর্তীতে ১৯৯৯ সালের ১৭ই নভেম্বর জাতিসংঘ ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

এরপর থেকে বাংলাদেশ সহ বিশ্বের মোট ১৮৮টি দেশে এ দিনটি ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে পালিত হয়। ২০২০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনের ৬৮ বছর হয়ে গেলেও ভাষা শহীদদের নিঃস্বার্থ ত্যাগের কথা কখনোই ভুলতে পারবোনা। আমরা আমাদের ভাষা শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই এবং তাদের আত্নার মাগফেরাত কামনা করি।

১৯৪৭ সালের ভারত-পাকিস্তান বিভক্তির পর ভাষা নিয়ে যখন তীব্র আন্দোলন শুরু হয় তখন ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি তারিখে বাংলাকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও অন্যান্য রাজনৈতিক কর্মী মিলে একটি বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে বের হয়।

তখন পুলিশের ১৪৪ ধারা আইন ভঙ্গ করে মিছিলটি ঢাকা মেডিকেল কলেজের কাছাকাছি এলে পুলিশ ১৪৪ধারা ভঙ্গের অজুহাতে আন্দোলনকারীদের উপর প্রবল গুলিবর্ষণ করে। এতে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন সালাম, বরকত,  রফিক,  জব্বার সহ আরো অনেকে।

২২ ফেব্রুয়ারি তারিখেও পুলিশের গুলিবর্ষণে শহীদ হন শফিক,  আউয়াল, সিরাজউদ্দিন এবং ওহিউল্লাহ সহ আরো অনেক। সব মিলিয়ে মোট ১০০জনের শহীদ হওয়ার কথা শোনা গেলেও এই ৮ জন শহীদের পরিচয় পাওয়া যায় এবং বাকিদের পরিচয় এখনও নাম না জানা অজ্ঞাতই থেকে গেছে।

এই ৮ জন ভাষা শহীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য একজন ভাষা শহীদ হলেন কিশোর অহিউল্লাহ। সালাম,  বরকত,  রফিক, শফিক,  জব্বারের পরিচয় আমরা সব সময়ই পাঠ্যপুস্তকে পড়ে থাকি। কিন্তু কিশোর অহিউল্লাহের ঘটনাটা অন্যরকম।

আরো পড়ুনঃ

 
Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.