পর্যটকদের জন্য হাকালুকি হাওর ফিরতে চায় আপন বৈচিত্রে

বর্ষা এবং শীত উভয় ঋতুই সিলেটে ঘুরে বেড়ানোর জন্য উপযোগী। শীতকালে এ হাওড়কে ঘিরে পরিযায়ী পাখিদের বিচরণে মুখর হয়ে উঠে গোটা এলাকা। শীতকালে বিস্তৃত এই হাওর ধু-ধু সবুজপ্রান্তর, কোথাও বা ধান ক্ষেত এবং খানাখন্দ নিচু ভূমিতে প্রায় ২৩৮ টি বিলের সমষ্টি। হাকালুকি হাওর মাছের জন্য প্রসিদ্ধ। হাকালুকি হাওর বাংলাদেশের সংরক্ষিত জলাভূমি। শীত মৌসুমে এশিয়ার উত্তরাংশের সাইবেরিয়া থেকে প্রায় ২৫ প্রজাতির হাঁস এবং জলচর নানা পাখি পরিযায়ী হয়ে আসে। এছাড়া স্থানীয় প্রায় ১০০ প্রজাতির পাখি সারাবছর এখানে দেখা মেলে।

হাকালুকি-হাওর

হাকালুকি হাওরঃ বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ হাওর ।

এটি এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম মিঠাপানির জলাভূমি। এর আয়তন ১৮,১১৫ হেক্টর, তন্মধ্যে শুধুমাত্র বিলের আয়তন ৪,৪০০ হেক্টর। এটি মৌলভীবাজার জেলার় বড়লেখা (৪০%), কুলাউড়া (৩০%), এবং সিলেট জেলার় ফেঞ্চুগঞ্জ (১৫%), গোলাপগঞ্জ (১০%) এবং বিয়ানীবাজার (৫%) জুড়ে বিস্তৃত। ভূতাত্ত্বিকভাবে এর অবস্থান, উত্তরে ভারতের মেঘালয় পাহাড় এবং পূর্বে ত্রিপুরা পাহাড়ের পাদদেশে। ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের কারণে উজানে প্রচুর পাহাড় থাকায় হাকালুকি হাওরে প্রায় প্রতি বছরই আকষ্মিক বন্যা হয়। এই হাওরে ৮০-৯০টি ছোট, বড় ও মাঝারি বিল রয়েছে। শীতকালে এসব বিলকে ঘিরে পরিযায়ী পাখিদের বিচরণে মুখর হয়ে উঠে গোটা এলাকা। হাকালুকি এলাকা মুলত সিলেট বিভাগে বিস্তির্ন।

হাকালুকি হাওর (hakaluki haor) বৃহত্তম সিলেট বিভাগের দুটি জেলা ও ৫টি উপজেলায় প্রায় ৪ লক্ষাধিক মানুষের জীবন জীবিকার অবিচ্ছেদ্য অংশ। মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার ভাটেরা, বরমচাল, ভুকশিমইল, জুড়ী উপজেলার পশ্চিম জুড়ী ও জায়ফরনগর এবং বড়লেখা উপজেলার দক্ষিনভাগ, সুজানগর, বর্ণী ও তালিমপুর, সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জের গিলাছড়া, গোলাপগঞ্জের শরীপগঞ্জ উত্তর বাদে পাশা ইউনিয়নগুলোর প্রায় ৫৫ হাজার একর জমিও হাকালুকি হাওরের অর্ন্তভুক্ত। এর মধ্যে ছোট বড় বিল রয়েছে ২৪০টি, প্রায় ২৫-৩০ বছর আগেও হাকালুকি হাওর সৌন্দর্য প্রেমীদের আকর্ষন করত । গড়ে উঠতে পারত বাংলাদেশের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র।

বর্ষা মৌসুমে হাকালুকিতে নৌকাযোগে পর্যটকদের আনাগুনা বেশ ভালেই ছিল। কিন্তু এখন আর এ দৃশ্য চোঁখে পড়ে না। কালের বিবর্তনে রক্ষনাবেক্ষন এর অভাবে হাকালুকি হাওড় তার অতীত সৌন্দর্য হারিয়েছে। অথচ এক সময় ধান ও মৎস্য ভান্ডার জলজ উদ্ভিদ বন্য প্রাণী ও অসখ্য পাখপাখালি অভয়াশ্রম ছিল এ হাওরে। ইতিমধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তর (সিএনআরএস) এর জীব বৈচিত্র ও পরিবেশ রক্ষায় হাকালুকির বিভিন্ন স্থানে মৎস্য পাখপাখালির নিরাপত্তার জন্য অভয়াশ্রম তৈরি করেছে। হারিয়ে যাচ্ছে হাকালুকির সকল সম্পদ ও হাজার বছরের ঐতিহ্য। হাকালুকি হাওরে অতীত ঐতিহ্য ও পরিবেশ রক্ষায় সরকারের নানা উদ্যোগের কমতি না থাকলেও উদাসীনতায় জনগনের মনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে !

মৎস্যজীবিদের ধারণা মিঠাপানির বৃহৎ ও উন্নত জাতের মাছের প্রজনন কেন্দ্র হল এই হাওর। প্রাকৃতিক ভাবে হাকালুকি হাওরে মাছের ডিম পাড়ার অনুকুল পরিবেশ রয়েছে। অন্য দিকে বৃহত্তর এ হাওরে মৎস্য সম্পদ নির্বিচারে নিধন হওয়ায় জুড়ী, কুলাউড়া ও বড়লেখা উপজেলায় এখন মাছের আকাল দেখা দিয়েছে। বর্তমানে ৩ উপজেলার হাটবাজারে দেখা দিয়েছে মৎস্য শুণ্যতা। প্রতি বছর সরকারী ভাবে হাকালুকি হাওরের বিলগুলি লিজ দেওয়া হলে অসাধু মৎস্যজীবিরা বেআইনী ভাবে সেচ দিয়ে বিল শুকিয়ে মাছ ধরে মাছের বংশ বিস্তার বাধাগ্রস্থ করেছে। তাছাড়া মৎস আইন লঙ্গন করে খেয়াল খুশিমত মাছ ধরেছে। এমনকি রেনু, পোনা ধরায় মাছের আবাসন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

হাওরের পাড়ের মানুষ গুলো ও সচেতন মহলের ধারণাঃ দেশের বৃহত্তম হাকালুকির মৎস ভান্ডার রক্ষা করতে হলে বিল সরকারী ভাবে সংরক্ষণ করা জরুরী। এছাড়া মৎস্যজীবিদের মৎস্য আইন মেনেচলা অতীব জরুরী। হাকালুকি হাওরের বিলগুলোতে প্রায় ১৫০ প্রজাতির মাছ বিলুপ্তির পথে। প্রতি বছর শীত মৌসুমে দেশ বিদেশী পাখীদের অবাদ বিচরনস্থল হাকালুকি হাওর। কিন্তু পাখি শিখারীদের তৎপরতায় পাখি শুন্য হতে চলেছে হাকালুকি।

মনোরম দৃশ্য উপভোগের জন্য সরকারী ও বেসরকারী ভাবে কার্যকর কোন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। হাওর উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে ফসল ও মৎস্য ভান্ডার রক্ষার পাশাপাশি হাকালুকি হাওরের অতীত ঐতিহ্য ফিরিয়ে এনে দেশী বিদেশী পর্যকটদের আকৃষ্ট করে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ানো সম্ভব বলে মনে করেণ পরিবেশ সচেতন মহল। এছাড়াও সুস্থ পরিকল্পনার অভাবে এশিয়ার অন্যতম ও দেশের বৃহত্তম হাওর হাকালুকি ক্রমশ তার অতীত সৌন্দর্য হারাচ্ছে।

পর্যটকদের জন্য উপযুক্ত সময়ঃ
বর্ষায় সাগর ও গ্রীষ্মে ধুধু মাঠ। এ এক অনাবিল সৌন্দর্য। শীতকালে হাকালুকি হাওর ভ্রমণের সেরা সময়। কারণ এ সময় পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পরিযায়ী পাখিদের পাশাপাশি মানুষেরও ঢল নামে। তাই নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাসটাই হাওর ভ্রমণের সেরা সময় হিসেবে বিবেচিত হয়। জলজ উদ্ভিদ আর মাছ প্রেমীদের জন্যও এ সময়টা সেরা। তখন এই হাওর থেকে প্রচুর মাছও ধরা হয়। তাই এ সময় এখানে মানুষের ভিড় লেগেই থাকে।

বর্ষাকালও কম যায় না, পর্যটকদের উল্লাসে বর্ষাকালে নীরব হাওরটি অনেকটা সরব হয়ে ওঠে। অনেকেই হাকালুকি হাওরকে বর্ষায় মিনি কক্সবাজার বলে থাকেন। বিনোদনের জন্য যুক্ত হয়েছে এখানে স্পিডবোট, জেটস্কি, স্কেডিং বোট ।


হাওর এলাকায় থাকার জন্য রয়েছে ইজারাদারদের তৈরি করা দোচালা কুটিরগুলো যেখানে কমপক্ষে পাঁচ জন থাকা যায়। তবে এর চেয়ে আরও ভাল হবে তাবু টানিয়ে থাকলে। কেননা রাতের বেলায় হাওর এলাকা থেকে জোছনা দেখার মজাই অন্যরকম। বিশেষ করে জোছনা রাতে তাঁবুতে রাতযাপন, পাখি পর্যবেক্ষণ যে কোনও অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় পর্যটককে বিমোহিত করবে। এই হাওরে ভ্রমণের জন্য সবচাইতে সুবিধাজনক স্থান হিসেবে ফেঞ্চুগঞ্জের ঘিলাছড়া জিরো পয়েন্টকেই বেছে নিচ্ছেন বিনোদনপ্রেমীরা।

Facebook Comments