নতুন সরকার- নতুন সম্ভাবনা কিন্ত পুরানো চ্যালেঞ্জ

নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশ মানুষ উন্নয়নের পক্ষে রায় দিয়েছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর তনয়া ৪র্থ বারের মতো সরকার প্রধানের দায়িত্ব পেয়েছেন। নির্বাচনের রেজাল্ট থেকে এটি অনুমান করা যায় বাংলাদেশের মানুষ উন্নয়ন চায় এবং মুক্তিযুদ্ধের শক্তির উপরে ভিত্তি করেই দেশ এগিয়ে যাক সেটিও চায়।

শেখ হাসিনার মন্ত্রীসভা বিরাট ইতিবাচক চমক। যদিও এই মন্ত্রীসভা দিয়ে বর্তমান চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে নতুন প্রজন্মের জন্য একটি রাষ্ট্র বিনির্মাণ সম্ভব হবে কি-না সেই মন্তব্য করা বাড়াবাড়ি হবে এই মুহুর্তে, তবে এই কথা আমাকে বলতেই হবে এই মন্ত্রীসভা বড্ড আশাজাগানিয়া।

এই মন্ত্রীসভা নবীন এবং প্রনবীনদের সমন্বয়ে শুধু গঠিত হয়েছে তাই নয়। এই মন্ত্রীসভা কেন্দ্রের রাজনীতিবিদ এবং প্রান্তের রাজনীতিবিদদের সমন্বয়ে গঠিত।
শেখ হাসিনার সাহসি সিদ্ধান্ত জাতি আগেও দেখেছে, এইবার আরেকবার প্রমাণ করেছেন গতানুগতিক রাজনীতির বাইরে পথ চলবার চেষ্টা শেখ হাসিনা সরকার করছেন।

এই মন্ত্রীসভায় হাওরের দুইজন মানুষ আছেন। দুইজনই আমার অত্যন্ত প্রিয়জন এবং শ্রদ্ধার পাত্র। এই দুইজনকে আমি অনেকদিন ধরেই চিনি জানি।

একজন জনাব মোস্তাফা জব্বার যিনি অনেকদিন ধরেই জাতীয় পর্যায়ে পরিচিত নিজের গুণেই। আরেকজন জনাব এম এ মান্নান যিনি বর্তমান রাজনীতির মধ্যে বসবাস করেন কিন্তু সমস্যা সমাধান চিন্তা নিয়েই যিনি প্রতিনিয়ত কাজ করেন। এই দুইজনের প্রতি আমার ব্যক্তিগত প্রত্যাশা অনেক। আমি মনে করি এই দুইজন সারাদেশের উন্নয়ন চিন্তার সাথে জন্মমাটি হাওরের টেকসই উন্নয়নে পদক্ষেপ নিবেন। হাওরকে সত্যিকারের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাবেন জাতির বৃহত্তর স্বার্থে।

বর্তমান সরকার ধারাবাহিক সরকার। ১৯৯৬ সালের সরকার আর ২০১৯ সালের সরকারের মধ্যে আকাশপাতাল তফাৎ।

১৯৯৬ সালে সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশা খুব বেশি ছিলো না কিন্তু আজকের সরকারের কাছে মানুষের পাহাড় সমান প্রত্যাশা।

নতুন সরকার কিন্তু সমস্যা পুরানো। আবার একইসাথে অসাধারণ সম্ভাবনা রয়েছে সরকারের সামনে।

সমস্যার সমাধান করেই এগুতে হবে সম্ভাবনার দিকে।

সমস্যাসমূহ সম্পর্কে বর্তমান সরকার সজাগ আছে বলেই বিশ্বাস করি। নির্বাচনী ইশতেহারে এবং সরকারের মন্ত্রীদের কথাবার্তায় স্পষ্ট হচ্ছে সমস্যার ধরণ। যদিও কথা বলে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয় তারপরও সমস্যা চিহ্নিত করতে পারা এবং সেটি স্বীকার করা একটি অগ্রগতি বটে।

সরকারের কথাবার্তায় পরিষ্কার যে সর্বগ্রাসী এবং সর্বব্যাপী দুর্নীতি হচ্ছে অন্যতম প্রধান সমস্যা। মাদক জঙ্গিবাদ সমাজ এবং রাষ্ট্রের জন্য বিপদজনক বলে সরকার যথার্থই চিহ্নিত করেছে।
বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা সনদ সর্বস্ব। এই শিক্ষাব্যবস্থা দিয়ে ৪র্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে টিকে থাকা অসম্ভব হবে। তাই শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর বিকল্প কিছু নেই। দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড রমরমা কিন্তু সেই কর্মকাণ্ড চালাতে গিয়ে নদী নষ্ট, খাল নষ্ট, পাহাড় এবং হাওর ধ্বংস। দখল এবং দূষণ এক বিরাট হুমকি জাতির জন্য। দখল দূষণ দূর করে টেকসই উন্নয়ন অব্যাহত রাখাও অন্যতম চ্যালেঞ্জ সরকারের সামনে।

ইতিমধ্যে সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা এইসব বিষয় খোলামেলা আলোচনা করছেন। বক্তব্য বিবৃতিতে জনগণের সামনে তুলে ধরেছেন। সমাধানের পথ কী কিংবা সরকার কীভাবে সমস্যা সমাধানের পথে অগ্রসর হবে তা এখনো পরিষ্কার নয়।

আমি যা মনে করি দুনীর্তি থেকে হাজারো সমস্যা তৈরি হয়েছে, হচ্ছে এবং হবে। দুর্নীতি শুধু ব্যক্তির বিষয় নয়, দুর্নীতি তৈরি হচ্ছে সিস্টেম থেকে। আমাদের বিদ্যমান সমাজ পদ্ধতি, রাষ্ট্র পরিচালনার যে পদ্ধতি তা থেকেই এই দুর্নীতির জন্ম এবং বিকাশ। সিস্টেম পরিবর্তন না করে ব্যক্তি পরিবর্তন করলে কাজের কাজ কিছুই হবেনা। প্রত্যেকটা প্রতিষ্ঠানকে যদি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে তৈরি করা যায়, যথাযথ জবাবদিহিতার আওতায় আনা যায় তবে দুর্নীতি কমে যাবে। দুর্নীতি কমানো সম্ভব কিন্তু দুর্নীতি একেবারে দূর করা অসম্ভব এই কথাটি এই প্রসঙ্গে বলে রাখা ভাল।

আমি সবসময় আশাবাদী মানুষ। এই সরকার নিয়ে আমি আশাবাদী এবং এই দেশ এবং দেশের মানুষ নিয়েও আশাবাদী। অসাধারণ একটি সুন্দর দেশ আমাদের। যে দেশের বেশিরভাগ মানুষ অসম্ভব পরিশ্রম করে সেই দেশ এগিয়ে যাবেই। বাংলাদেশের মাটি উর্বর। এই মাটির উপরে দাড়িয়েই আমাদের আগামীর ভিত্তিমূল তৈরি করে নিতে হবে।

৪র্থ শিল্পবিপ্লব আমাদের সামনে সুযোগ নিয়ে উপস্থিত হয়েছে। আমরা যদি আমাদের তরুণ-তরুণীদেরকে যথাযথ প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষার ব্যবস্থা করতে পারি। আমরা যদি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় আত্মবিশ্বাস এবং স্বপ্নের চাষবাস শুরু করি তবেই আগামীদিনের যোগ্য নেতৃত্ব আমরা পাব। বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় আত্মবিশ্বাসী এবং স্বপ্নবাজ মানুষ তৈরি হয়না, তৈরি হয় কেরানি এবং এই মুহুর্তে যেহেত লাখে লাখে কেরানি রাষ্ট্রের দরকার নেই তাই লাখে লাখে শিক্ষিত তরুণ আমরা পাচ্ছি। কাজ না দিতে পারলে ডেমগ্রাফিক ডিভিটেন্ট অর্জন করতে আমরা ব্যর্থ হব চরমভাবে। মানুষকে সম্পদে পরিণত করতে না পারলে সে বিপদগামী হয়ে মানববোমায় পরিণত হওয়া অসম্ভব নয়।

আমরা যদি সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করে একটি বিনিয়োগ ও ব্যবসাবান্ধব নীতি প্রতিষ্ঠিত করতে পারি তাহলে দেশেবিদেশের বিনোয়োগের বন্যা হবে এখানেই। কারণ তারুণ্যনির্ভর দেশে বিনোয়গ না হবার কোন কারণ নেই। সস্তায় শ্রম বিক্রির ধারণার বাইরে গিয়ে “ সঠিক মানুষ, প্রতিযোগিতামূলক খরচ এবং কর্পোরেট সুশাসন” নিশ্চিত করতে হবে। আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে আমুল পাল্টে একশতভাগ ডিজিটাল এবং বিনিয়োগবান্ধব প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতেই হবে।

গণপরিবহনকে রেলপথ, নদীপথ এবং সড়কপথ এই তিনের উপরে সমন্বিত ধারণা এবং বাস্তবায়ন করতে হবে। বাংলাদেশ নদীমাত্রিক তাই নদীকে উপেক্ষা করে গণপরিবহন চিন্তা করা কোনভাবেই যুক্তিসংগত নয়।

আমাদের সামনে মধ্যম আয়ের দেশের সম্ভাবনা বাস্তবে ধরাছোঁয়ার মধ্যে এখন। উন্নত অর্থনীতির দেশ হওয়াও অসম্ভব নয়। অর্থনীতির এই মহাসম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে আমাদেরকে একটি সুশাসনের দেশ হতে হবে, আমাদেরকে নিশ্চিত করতে দ্রততম সময়ে চলাচল, নিরাপদ এবং নিশ্চিত বিনিয়োগের আশ্বাস এবং নিশ্চয়তা প্রদান করতে হবে। একইভাবে শ্রমিকবান্ধব আইনকানুন এবং বিচার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। শিল্পে শান্তি নিশ্চিত করতে শ্রমিকদের প্রাপ্য হিস্যা নিশ্চত করতে হবে। শ্রমিক ঠকিয়ে কোনভাবেই টেকসই শিল্পোন্নয়ন হবেনা।
বর্তমান সরকার সফল হবে বলেই আমার ধারণা।

সুব্রত দাশ খোকন
এডভোকেট এবং উন্নয়ন কর্মী
Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.