একুশে বইমেলা ও কিছু কথা

শেষ হয়ে গেলো অমর একুশে বইমেলা ২০১৯। কেমন গেলো প্রাণের উৎসব বইমেলা? বই মেলা, বই বিক্রি ও পাঠ্যাভাস বিবিধ বিষয় নিয়ে লিখছেন কবি ও লেখক মো মেহেদী আরিফ

এবারের একুশে বইমেলায় প্রথম যেদিন প্রবেশ করি সেদিন মনে একটা প্রশ্ন জেগেছিলো, “এত মানুষ! সবাই কি বই কিনতে এসেছে?” তারপর গভীরভাবে উপলব্ধি করলাম একটি কথা ভেবে যে, প্রত্যেকেই যদি একটি করে বইও কিনতো তাহলে মেলায় প্রচুর বই বিক্রি হতো। আসলে কি সবাই বই কিনতে যাই মেলায়? দৃঢ় ও দ্বিধাহীনচিত্তে এ কথা বলা যায় যে, আসলে সবাই বই কিনতে আসে না, আসে মানুষ দেখতে, ফটো তুলতে, আড্ডা দিতে, আবদার মেটাতে, বন্ধুদেরকে সময় দিতে।

তবে বর্ণালী সব আয়োজনের মাঝে যদি বই কেনার অভ্যাস গড়ে উঠতো তাহলে দারুণ হতো। নতুন বই প্রকাশের পর চাতকের মতো অপেক্ষা করতে হয় লেখক ও প্রকাশককে। ফসলের আশায় যেমন কৃষককে অপেক্ষা করতে হয় ধৈর্য ধরে, অনুরূপভাবে একজন লেখক কিংবা প্রকাশককেও অপেক্ষা করতে হয়। পাঠক ছাড়া লেখক ও প্রকাশকরা অচল। পাঠকের সরব উপস্থিতি ও বই বিক্রি প্রকাশক ও লেখকদের মনে এক অদ্ভুত অনুভূতির জন্ম দেয়। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, “সবার বই কি সমান বিক্রি হচ্ছে?” উত্তরটি জোরেশোরে বলা যায়, “না।”

অনলাইনে তরুণ কিছু লেখকের বই প্রকাশের ঘটনায় অনেক বয়োজ্যেষ্ঠ লেখকের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। অনেকে তরুণদের লেখাতে জ্ঞানের পিদিম জ্বালিয়ে সাহিত্য মান তালাশ করছেন, অনেকে সাহিত্য উপাদান খুঁজে পাচ্ছেন না; অনেকে ভাবছেন কিশোর-কিশোরীরা ছাড়া ঐ বই কিনছেনা কেউ। এটা বয়োজ্যেষ্ঠ লেখকদের ঘৃণা, দুঃখ, ক্ষোভ নাকি অযোগ্যতা তা ব্যাখ্যার দাবি রাখে। তরুণ লেখকদের বই বিক্রি হচ্ছে ভেবে আমি পুলকিত হই। তরুণদের মিডিয়া কভারেজ ভালো। তারা নিজেদেরকে প্রচার করতে পারে।

তরুণদের এই প্রচারকে অনেকে নেতিবাচকভাবে নিচ্ছেন, ভুরু কুঁচকে কেউ কেউ বলছেন, “রাবিশ।” কিন্তু রাবিশ বলে লাভ নেই। কেউ রাবিশ বলে তরুণ লেখকদেরকে ছোট করতে গিয়ে তাদেরকে বড় করে ফেলছেন। এটাই মিডিয়া, এটাই প্রচার। আমরা যদি এখান থেকে দুই দশক আগের কথা বিবেচনায় আনি তবে বুঝতে পারবো তখনকার দিনের অবস্থা ও আজকের অবস্থার মধ্যে কত ফারাক। আগে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহার এত প্রবল ছিলো না আজ যেমনটা আমরা দেখছি।

এখন অনলাইনে প্রচারের দারুণ সব মাধ্যম তৈরি হয়েছে। অনেক লেখক নিজেদেরকে প্রচার করার সুযোগ পাচ্ছেন। এই সুযোগকে যারা কাজে লাগাচ্ছেন তারা বেশি মানুষের দ্বারে পৌঁছাতে সক্ষম হচ্ছেন। এটাকে কিছু প্রচারবিমুখ লেখক নেতিবাচকভাবে নিচ্ছেন। তাদের প্রতি আমার কয়েকটি প্রশ্ন, “আপনারা কি নিজেদের নিয়ে হতাশ? নিজেদের বই বিক্রি হচ্ছে না বলে মন খারাপ করছেন? অন্য লেখকদের সফলতা দেখে আপনার হিংসা হচ্ছে? মেলায় যা আসছে সব ছাইপাশ আসছে? আচ্ছা, আপনার প্রথম বই নিয়েও কি অন্যরা এমন মন্তব্য করেছিলো যে, আপনার লেখা ছাইপাশ? সব লেখা কি ছাইপাশ? আপনি কয়টি বই পড়ে এমন মন্তব্য করছেন? নিজের লেখাকে কি সর্বত্র শ্রেষ্ঠ মনে করছেন? সবসময় রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ, বঙ্কিম, শরৎ, মানিক, বিভূতিকে টেনে এনে আপনি কি বোঝাতে চাচ্ছেন? তরুণরা কি লেখক হয়ে উঠবে না? কয়জন তরুণকে পরামর্শ দেওয়ার পরিবর্তে ছোট করেছেন, কটাক্ষ করেছেন?”

এ প্রশ্নগুলির উত্তর আমি মনেপ্রাণে কামনা করি। তথাকথিত এই লেখকশ্রেণি নিজেদের লেখার ব্যাপারে অন্যের সমালোচনা ও তিরস্কার গায়ে মাখবেন কি? ভেবে দেখার বিষয়। ডিজিটাল যুগে এসে এনালগ থাকার মাঝে কোনো সার্থকতা আমি দেখি না। কেউ প্রচারবিমুখ বলে নিজেকে দাবি করলে তা এ যুগে বড়ই হাস্যকর মনে হয়। নিজের লেখা সেরা দাবি করবেন আবার বলবেন এত প্রচারের কি দরকার! দুটি বিষয় উপলব্ধির বিচারে কেমন যেন পানসে মনে হয়। বর্তমান যুগ প্রচারের যুগ। যত প্রচার হবে ততই লেখক, প্রকাশক ও পাঠকের জন্য মঙ্গল।

তবে, হ্যাঁ, লেখার মানের দিকে নজর দেওয়া জরুরি। এর জন্য প্রচুর অধ্যয়ন, উপলব্ধি ও চিন্তার স্ফুরণ এই তিনের সমন্বয় সাধন অতীব জরুরি। অনেক সেরা লেখা ও সেরা লেখক মৃত্যুর পরে পাঠকের সামনে আসে? কেনো আসে? এর কারণও নানাবিধ। যে লেখক মৃত্যুর পরে অনেক প্রভাবশালী হয়ে উঠছেন তিনি জীবদ্দশায় হয়তো তার লেখা প্রচারের সুযোগ পাননি, কিংবা হয়তোবা তার সুযোগ হয়ে ওঠেনি। অনেকে দাবি করেন, কোনো কোনো লেখক নিজেকে প্রচার করতে চান না। তাহলে তার লেখার কী দরকার? বই আকারে প্রকাশ কেন করতে হবে? ব্যক্তিগত ডায়েরি আকারেই থাক না তা! বই প্রকাশ করবেন, প্রচার করবেন না কিংবা প্রচার করার ক্ষেত্রে এলার্জি, এ বিষয়টিকে আমার কাছে বিয়াইকে নৌকায় তুলে দিয়ে থাকতে বলার মতো মনে হয়।

এবারের বইমেলায় গিয়ে কিছু তরুণ লেখকদের বই কেনার জন্য পাঠকদের ভীড় দেখে অভিভূত হয়েছি আমি। অনেক লেখক ও সমালোচক এটাকে নিয়ে কটাক্ষ করেন। তাদের বিদ্যার দৌড় এ পর্যন্তই। তাদেরকে যখন প্রশ্ন করা হয়, এ সব তো ছাইপাশ লেখা তাহলে আপনি ওদের জন্য কিছু লেখেন। তখন তাদের ভাব এমন যে, তাদের লেখা পড়ে কেউ বুঝবে না। কেন বুঝবে না? কারণ তারা (তরুণ পাঠক) পরিণত হয় নি। তাহলে আমার কথা হল, কিছু শিশু-কিশোর-তরুণ-তরুণীদের বই আপনারা লিখুন। তখন তারা নাক কুচকিয়ে বলবেন, “ওসব বই লেখা আমার কাজ না।

আমি কারো জন্য লিখি না।” আমার কথা হল, তাহলে আপনি লিখতে থাকুন নিজের জন্য। পাঠক শ্রেণি পরিণত হোক, তারপর আপনার পরিণত বই তারা পড়বে। শিশু-কিশোরদের জন্য সেরা লেখক তৈরি হওয়া দরকার যারা শিশুদের উপযোগী দারুণ সব বই বের করবে। আরেকটি বিষয় মাথায় রাখা দরকার, এখন গরুরগাড়ির যুগ নয়, এরোপ্লেনের যুগ, ইন্টারনেটের যুগ। তাই এ যুগে রুচিতে পরিবর্তন আসবে এটাই স্বাভাবিক। তবে কে কোন ধরনের বই পড়বে তা নির্ধারণ করতে শেখাও যোগ্যতার ব্যাপার। শিশু-কিশোরদের বই নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে অভিভাবককে অত্যন্ত সচেতনতা অবলম্বন করা উচিত।

মেলায় অন্য বছরের থেকে ভীড় অনেক বেশি ছিলো। বাংলা একাডেমি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান যেন প্রাণের উচ্ছ্বাসে মেতে উঠেছে এক দারুণ উল্লাসে। শত শত বইয়ের স্টলে আগত তৃষ্ণার্ত পাঠকের ঢল মুগ্ধ করার মতো। বেশ কিছু স্টলে বই বিক্রি হচ্ছে দেদারছে। এটার কারণ অনুসন্ধান করলে জানা যায়, কিছু জনপ্রিয় লেখকের বই প্রকাশ করার কারণে এই ভীড়। বইয়ের মান বিবেচনার চেয়ে বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে সোস্যাল মিডিয়াতে তারা কতটুকু জনপ্রিয়। মিডিয়ার জনপ্রিয়তার কারণে তারা কোনো বই প্রকাশ করেই বাজিমাত করছেন।

কেউ কেউ আবার লিখছেন বেশ। তাদের লেখা পড়ে হাজার হাজার পাঠক তাদের ভক্ত বনে যাচ্ছে। আবার অনেকেই আছেন যারা এ সকল লেখকের কোনো বই না পড়ে অনর্থক মন্তব্য করছেন। ভিন্ন ভিন্ন ঘটনার অপূর্ব সব আয়োজনের মাঝে বই বিক্রি চলছে। তবে বইয়ের মানের দিকে নজর দেওয়া অতীব জরুরি। অনেক লেখকের বই হয়তো মানসম্মত কিন্তু বিক্রি হচ্ছে কম। এর নেপথ্যে মিডিয়ার সাথে সংশ্লিষ্টতা না থাকা কিংবা প্রচারের ঘাটতি অনেকাংশে দায়ী। তাই ভালো বই প্রচার হওয়া জরুরি, সাথে সাথে বইয়ের সমালোচনা হওয়া দরকার। সমালোচনায় কাদা খোঁচাখুঁচি কাম্য নয়। অনেক লেখকের রচনা সমগ্র বের হয়েছে।

কোনো কোনো প্রকাশনী বেশ মানসম্মত বই বের করেছে। কোনো কোনো প্রকাশনী দায়সারা কাজ করেছেন। আবার অনেক প্রকাশনী অনেক সেরা লেখকের বই প্রকাশ করছেন না ভালো পাঠক তৈরি হয় নি বলে। এর জন্য এককভাবে প্রকাশক ও পাঠককে দোষারোপ করা চলে না। কারণ যে জাতি জিপিএ-৫ ও বিসিএসের প্রতিযোগিতায় সর্বত্র দৌঁড়ায় তারা পাঠক হয়ে উঠবে কিভাবে? সারাদিন সিলেবাসের বই পড়তে অভ্যস্ত হয়ে ওঠা শিক্ষার্থীটি বাইরের বই পড়ার সময় পাবে কিভাবে? যদি সে সময় পায়ও সহজ বই-ই সে পড়তে চাইবে, যেটি পড়ে সে মজা পাবে, যার ভাষা সে সহজে আত্মস্থ করতে পারবে। কিছু পাঠক আছে যারা একই ধরনের বই পড়তে অভ্যস্ত।

তারা ভিন্ন ধরনের লেখা কিংবা অন্য লেখকের বই পড়ার প্রতি অনীহা প্রকাশ করেন। এখানেও বেশ বিচিত্রতা দেখা যায়। নজরুল, রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিমদের বই পড়ার পাশাপাশি তরুণদের বইও পড়া জরুরি। একুশে বইমেলায় অনেক ধরনের বই পাওয়া যায়, তাই পাঠককূলকে খুব বেশি কষ্ট পোহাতে হয় না বই সংগ্রহের জন্য। ক্ষুদ্র গণ্ডির মাঝে বিশাল বইয়ের আয়োজন মুগ্ধ করার মতো। তবে পাঠকের কথা মাথায় রাখতে হবে প্রকাশকের। অনেক পাঠক আছেন যারা অর্থাভাবে বই কিনতে পারেন না। কিন্তু পঠনপাঠনে তারা অত্যন্ত উচ্চমার্গীয় ও সিদ্ধহস্ত।

বইয়ের মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে পাঠকের কথা মাথায় রাখা উচিত। এ ক্ষেত্রে প্রশাসনের সহযোগিতা একান্ত কাম্য। কোনো পাঠক যেন বইয়ের অতি উচ্চমূল্যের কারণে বই কেনা থেকে বঞ্চিত না হয়। শিশু-কিশোরদেরকে বইপড়াতে অভ্যস্ত করতে অভিভাবক, শিক্ষক, সরকার সকলের একাত্মতা ও সংশ্লিষ্টতা দরকার। বিজ্ঞানের যুগে এসে বই বিমুখ হয়ে ওঠার মাঝে কোনো সার্থকতা নেই। উন্নত মন কিংবা উন্নত জাতি বিনির্মাণে এ জাতির প্রচুর সচেতন পাঠক দরকার, যারা কেবলমাত্র আনন্দ পাওয়ার জন্য বই পড়বে না, বরং চিন্তার জন্য বই পড়বে, সমৃদ্ধির জন্য বই পড়বে, এগিয়ে যাওয়ার জন্য বই পড়বে। বই হোক অদম্য মানস তৈরির এক অপ্রতিরোধ্য টনিক।

আরও পড়ুন

হিংসুক নিন্দুক জানুক কেনো বেস্ট সেলার!

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.