ঐতিহ্যবাহী হাজীর বিরিয়ানি

হাজীর বিরিয়ানি

বাংলাদেশ আয়তন ও ক্ষেত্রফলে বেশী নয় কিন্তু নদী নালা, খাদ্যশস্য, গাছপাতা আর মানুষে ভরা একটি দেশ।

নানা রংয়ের মানুষ বাস করছে। আর যুগ যুগ ধরে তারা জিবহার স্বাদ বাড়াতে চর্চা করছে নানা সুস্বাধু খাবারের।

ফলে বিভিন্ন এলাকায় ভিন্ন ভিন্ন খাবারের স্বাধ আর যশ দুই বৃদ্ধি পেয়েছে। তথ্য আর যোগাযোগের সুবিধায় এক জেলার খাবার আরেক জেলায় তথা সারা বাংলা এমনকি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বাঙালীদের কাছে পৌঁছে যায়।

ঐতিহ্যবাহী সুস্বাদু এসব খাবারের স্বাদ, গন্ধ কিংবা অনুভুতি কোন কিছুতেই সেগুলো কম যায় না। যদি আমরা এভাবে বলি কোন জেলা কোন খাবারের জন্য বিখ্যাত তাহলে সেটার তালিকা সংক্ষেপে বর্ননা করা যাবে কিন্তু আজ আমরা ঢাকার ঐতিহ্যবাহী হাজীর বিরিয়ানি নিয়ে কথা বলব।

ঢাকাইয়ারা অত্যন্ত ভোজনরসিক। মোগল প্রাদেশিক রাজধানী হিসেবে অনেক আগে থেকেই উত্তর ভারতীয় খাবারগুলো এখানে জনপ্রিয়।

এখানে উল্লেখযোগ্য খাবারগুলো হলো- বিরিয়ানী, কাচ্চি বিরিয়ানি, পাক্কি বিরিয়ানি, টিক্কা, জালি কাবাব, কাঠি কাবাব, শাম্মি কাবাব, বটি কাবাব, নার্গিস কাবাব, শিক কাবাব, দই বড়া, মুরগি মুসাললাম, খাসির পায়া, মোরগ পোলাও, নানরুটি, বাকরখানি, নিহারী, বোরহানী, লাবান ইত্যাদি।

রসনা বিলাসে ঢাকার নাম ডাক আছে শত শত বছর ধরে। এখানকার মানুষেরা মসলা সমৃদ্ধ খাবার বেশী পছন্দ করে। আগেকার সেই সোনারগাঁ বন্দর দিয়ে মসলার জাহাজ এসে ঠেকতো এখানে। ফলে মসলা এখানকার মানুষের জিবে সেটেঁ আছে।

তাই নানা পদের বিরিয়ানি এখানকার লোকদের খাবারের বিলাসিতার অংশ। কারো কারো কাছে আজকাল সেটা নিত্য আহার হয়ে যায়। পুরান ঢাকার মানুষের হাজারো খাবার তালিকায় নি:সন্দেহে বিরিয়ানি প্রথম সারিতেই রয়েছে।

পুরান ঢাকার খাবার তালিকায় বিরিয়ানি হওয়ার অনেক কারণও রয়েছে। মোগল আমল থেকে ঐতিহ্যগতভাবেই এ এলাকার মানুষের খাবার-দাবারে ছিল নবাবি সংস্কৃতি। সেই ঐতিহ্য পুরান ঢাকাবাসী আজও ধরে রেখেছে। আর এই খাবার সরবরাহে বেশকিছু জনপ্রিয় খাবারের মধ্যে হাজীর বিরিয়ানি অন্যতম।

  • পরিচিতি

যদি বলা হয় হাজী মুহাম্মদ হোসেনের বিরিয়ানি তাহলে হয়তো অনেকই চিনবেননা। সংখ্যাটা আসলেই অনেকে নয় বরং অনেকের চাইতে বেশী হবে। কারণ হাজী মুহাম্মদ হোসেনের বিরিয়ানির নামটার খুব একটা প্রচলন নেই, এর প্রচলিত নাম হচ্ছে হাজীর বিরিয়ানি। এবার সবাই এই নামে চিনতে কোন অসুবিধা হবে না।

ঢাকার বংশাল থানাধীন নাজিরা বাজারের ৭০ কাজী আলাউদ্দিন রোডে অবস্থান হাজী বিরিয়ানির। ১৯৩৯ সাল থেকে এই বিরিয়ানির যাত্রা শুরু এবং এখনো চলছে গৌরবের সাথে ও ঐতিহ্যের সাথে।

বংশ পরম্পরায় এই ব্যবসা দীর্ঘদিন ধরে রেখেছে হাজী হোসেনের পরিবারের লোকজন। মরহুম হাজী মুহাম্মদ হোসেনের মৃত্যুর পর এই ব্যবসার হাল ধরেন তার পুত্র হাজী গোলাম হোসেন।

২০০৬ সালে হাজী গোলাম হোসেনের মৃত্যুর পর তার পুত্র হাজী মুহাম্মদ শাহেদ হোসেন এই ব্যবসার হাল ধরেন। এখন এই ব্যবসার দেখাশোনা করেন হাজী মুহাম্মদ বাপী যিনি হাজী মুহাম্মদ হোসেনের নাতি হন।

  • বিশেষত্ব

ঐতিহ্যবাহী হাজীর বিরিয়ানির বিশেষত্ব হচ্ছে তারা বিরিয়ানি রান্নায় ঘি বা বাটার ওয়েল এর পরিবর্তে শুধু সরিষার তেল ব্যবহার করে। এই দোকান বা রেস্টুরেন্টের কোন সাইনবোর্ড নেই কিন্তু এক নামে সবাই চেনে।

হাজীর বিরিয়ানি প্রস্তুত করা হয় শুধু খাসির মাংস দিয়ে, অন্য কোন মাংস দিয়ে এই বিরিয়ানি তৈরী করা হয় না। নাজিরাবাজার শাখায় গেলে আরেকটি বিশেষত্ব পাওয়া যায় এই বিরিয়ানির, সেটি হলো পার্সেল দেওয়ার ক্ষেত্রে।

কাঁটালের পাতার বিশেষ এক টোঙায় করে এই বিরিয়ানি পার্সেল করা হয়। অন্য কোন কাগজ কিংবা বক্সে পার্সেল দেওয়া হয় না। হাজীর বিরিয়ানির এটিও একটি ঐতিহ্য হিসেবে ধরা হয়।

  • নতুন সংযোজন 

ঐতিহ্যবাহী হাজীর বিরিয়ানির নতুন সংযোজন হিসেবে এখন পাওয়া যাচ্ছে হাজীর বোরহানি। এটিও এখন কেবল প্রধান শাখায় পাওয়া যায়, তবে শিগগিরই হয়ত অন্য শাখাগুলোতে এটিও পাওয়া যাবে।

  • শাখাগুলো

ঢাকার বংশাল থানাধীন নাজিরাবাজারের ৭০ কাজী আলাউদ্দিন রোডে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী হাজী বিরিয়ানির প্রধান শাখা। এর আর দুটি শাখা হচ্ছে মতিঝিল আর বসুন্ধরা।

মতিঝিল শাখার ঠিকানা হচ্ছে, ৯৯ মতিঝিল (করিম চেম্বার) বিমান অফিসের পাশে। এটি খোলা থাকে দুপুর ১২ টা থেকে বিকাল ৪ টা পর্যন্ত। বসুন্ধরা শাঁখার ঠিকানা হচ্ছে ক,১১/৬এ বসুন্ধরা রোড, বারিধারা ঢাকা-১২২৯। এটি খোলা থাকে দুপুর ১২ টা থেকে রাত ৮ টা পর্যন্ত।

  • খাবার সরবরাহ

সকাল ৭ টা থেকে ৯টা এবং সন্ধা ৭ টা থেকে রাত সাড়ে ৯ টা এই দুইসময়ে বিরিয়ানি পাওয়া যাবে আলাউদ্দিন রোডের ঐতিহ্যবাহী হাজীর বিরিয়ানি দোকানে।

তবে যত চাহিদাই থাকুক সকালে দুই ডেকচি ও বিকালে তিন ডেকচির বেশী বিক্রি করা হয় না। তবে ইদানীং এখান থেকে রান্না করা খাবার নিয়ে মতিঝিল ও গুলশান শাখাতে পরিচালিত হচ্ছে।

আলাউদ্দিন রোডের প্রধান শাখা থেকে বাসার জন্য বিরিয়ানি নিতে হবে ওদের তৈরী ‘কাটাল পাতার’ পার্সেলে করে। শাখাগুলোতে দুইভাবে বিরিয়ানি সরবরাহ করা হয়।

প্রথম ভাগের খাবার দুপুর বারোটার আগেই বড় হাড়িতে করে পাটিয়ে দেওয়া হয়। প্রত্যেক শাখায় আনুমানিক দুই ডেগ করে বিরিয়ানি যায় প্রতি বেলায়। তবে বিভিন্ন ছুটির দিন ও উৎসবে আরও বেশী চাহিদা থাকে বিরিয়ানির।

আবার সন্ধার আগে দ্বিতীয় দফায় আরও খাবার আনানো হয়। পুরো ঢাকাতেই হাজীর বিরিয়ানির চাহিদা প্রচুর। তাই অনেকেই মনে করেন এর আরও শাখা বাড়ানো উচিত।

  • বড় পরিসরে

যেকোন বড় অনুষ্টান কিংবা আয়োজনে অর্ডার সরবরাহ করে থাকে হাজীর বিরিয়ানি। রমজান মাসে উচ্চপদস্থ স্থান থেকেও অর্ডার আসে।

তাছাড়া বিভিন্ন নামিদামি ব্যাক্তি তাদের বিভিন্ন অনুষ্টানে এখান থেকে বিরিয়ানির অর্ডার করেন এবং এখানে খেতেও আসেন। ঐতিহ্য আর খাবারের গুনগত মান বজায় থাকার কারনে হাজীর বিরিয়ানি এখনও সমানভাবে জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছে।

  • দামদর

প্রতি প্লেট বিরিয়ানির মুল্য ধরা হয়েছে ১৪০ টাকা এবং সব শাখায় এই দাম একই। নতুন সংযোজিত বোরহানীর দাম ১২০ টাকা প্রতি লিটার।

  • কিভাবে যাবেন

পুরান ঢাকার কাজী আলাউদ্দিন রোডে পা রেখে একটু সামনে এগুলেই দেখা মিলবে হাজীর বিরিয়ানির দোকানের।

ঢাকার যেকোন এলাকা থেকে হাজীর বিরিয়ানির প্রধান শাখা পুরান ঢাকায় যাওয়া যাবে। সদরঘাটগামী যেকোন বাসে বংশাল কিংবা গুলিস্তান পর্যন্ত বাসে করে যেতে হবে। এরপর রিকশাওয়ালাকে বললেই নিয়ে যাবে হাজীর বিরিয়ানিতে।

লেখকঃ Mustafa Shakir

আরও পড়ুনঃ হাঁস-বাঁশ সিলেটের একটি ঐতিহ্যবাহী খাবার

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.