আমরা সংস্কৃতির চর্চা করছি, নাকি অপসংস্কৃতির?

প্রত্যেক জাতির জীবনধারাই হচ্ছে তার সংস্কৃতি। ডিজিটাল এ যুগে আমরা আধুনিকতা দেখাতে সংস্কৃতিকে মেনে চলছি, নাকি অপসংস্কৃতির পিছনে ছুটে বেড়াচ্ছি; তা বুঝা দায়।

প্রত্যেক জাতির যুগ-যুগান্তরের স্বপ্ন সাধনা, চিন্তা-চেতনা, মানবীয় আচার-পদ্ধতি, পারিপার্শ্বিকতার প্রভাব সবকিছুর সমন্বয়ে সৃষ্টি হয় সংস্কৃতির ধারা। আর শিক্ষা ও সভ্যতার অবনতি ঘটিয়ে যে সংস্কৃতি মানুষকে সুন্দর থেকে দূরে সরিয়ে দেয় তাই অপসংস্কৃতি।

সংস্কৃতি মানে পরিশীলিত ও সুন্দর জীবনচেতনা। কিন্তু বিদেশীয় সংস্কৃতি অনুকরণের ফলে আমরা আজ আমাদের মূল সংস্কৃতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। দুর্বল দেহ যেমন সহজে রোগাক্রান্ত হয়, ঠিক তেমনি নানান অপসংস্কৃতি বাংলার সমাজ দেহকে আজ কলুষিত করছে। অপসংস্কৃতির এ অশুভ ছায়ায় আজ আমরা বাস করছি।

একসময় যাত্রাগান, পালাগান, জারি-সারি, বাউল, কীর্তন, ভাটিয়ালি যেমন মানুষের মনে আলোড়িত করেছিলো, ঠিক তেমনি বাংলার বঙ্গ সংস্কৃতি কে সমৃদ্ধ করেছিলো। আর আজ আমরা আবেগপ্রবণ হয়ে বিদেশী গান, অশোভন নাচ এমনকি পোশাক পরিচ্ছদ নকল করে নিজের সংস্কৃতিকে অপমানিত করছি। এসবকে কখনোই আমাদের সংস্কৃতি বলা যায়না। কারণ, এসব গান, নাচ আর পোশাকের সঙ্গে আমাদের দেশের প্রকৃতির কোন সম্পর্ক নেই।

তারপরও এসব কিছু আমাদের সর্বস্তরের জাতিকে আজ যেন গ্রাস করে ফেলেছে। সাহিত্যের নামে কুরুচিপূর্ণ রচনায় বাজার রমরমা, সমাজ সেবার নামে দলাদলি, ধর্মের নামে লোক দেখানো কিছু আচার-অনুষ্ঠান আর সংগীতের নামে সংগীতহীন কিছু হৈচৈ আমাদের সংস্কৃতির অবক্ষয়কে স্পষ্ঠ করে তুলছে।

আমরা আজ ডিসকো গান, নাচ আর পাশ্চাত্য মডেলের পোশাকের মোহে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছি। আমরা ভুলতে বসেছি আমাদের বাঙ্গালী পোশাক আর আচার-ব্যবহার। কিন্তু বিদেশের সবকিছুই আমাদের জন্য অপসংস্কৃতি নয়। কথায় আছেনা নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি মানুষের আগ্রহ বেশী। তবে আজকের তরুণ সমাজ ভালো দিককে উপেক্ষা করে খারাপটাকেই গ্রহন করছে।

বর্তমান তরুণ সমাজ এমন সব বিষয়ের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ছে; যা তাদের জীবনকে ধ্বংসের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। আজ সকল অপসংস্কৃতি বাংলার সংস্কৃতির আসন দখল করে নিচ্ছে। ফলে, সত্য ও সুন্দরকে বিসর্জন  দিয়ে তরুণরা উগ্র জীবনবোধে মাতাল হয়ে উঠেছে।

আজকাল অনেক ছেলেদের কানে দুল, একহাতে মেয়েদের মতো পিতলের বালা পরতে দেখা যায়, দেখা যায় মেয়েদের মতো লম্বা চুল বেঁধে রাবার ব্যান্ড দিয়ে বেঁধে রাখতে। এসব ফ্যাশন করে তাদের মনে আনন্দ হলেও এগুলো অপসংস্কৃতির নামান্তর।

আবার, কিছু মেয়েরা ছেলেদের মতো শার্ট, টাইট জিন্স-প্যান্ট, বয়কাট চুল নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। এগুলো দেখতে যেমন রুচিশীল  নয়, তেমনি সুখকরও নয়।

তাছাড়া, দুর্নিবার নেশায় যুবসমাজের এক বৃহৎ অংশ ছুটে চলছে অনিশ্চয়তার পথে। তারা দিন দিন নানা রকম নেশা সামগ্রীর প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ছে। যুবসমাজের এ অপসংস্কৃতি-প্রিয়তা সুস্থ সমাজের বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে।

এসকল উগ্র জীবনবোধ থেকে যুবসমাজ বিরত না হলে জাতীয়  ঐক্য বিনষ্ট হবে। রোগীর মধ্যে যেমন রোগ থেকে পরিত্রাণের প্রতিষেধক থাকে। ঠিক তেমনি যুবসমাজের মধ্যেই সক্রিয়, সজাগ ও আদর্শবাদী মানুষ রয়েছে। তারাই পারে এ অপসংস্কৃতির বেড়াজাল ভেঙ্গে সংস্কৃতির চর্চা করতে।

বাঙ্গালীদের সংস্কৃতির ঐতিহ্যের ধারা সুদীর্ঘকালের। আমাদের উচিৎ সংস্কৃতির ভালো দিক গ্রহণ করা আর খারাপ দিক বর্জন করা। বাঙ্গালী জাতি যেমন উদার তেমনি তাদের হৃদয়েও আছে সংগ্রামী মনোভাব। আমরা যদি অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে আমাদের এ সংগ্রামী মনোভাবকে কাজে লাগাই, তবেই হয়তো আমরা সুশীল সমাজ গড়ে তুলতে পারবো।

লেখকঃ Samia Rahman
আরও পড়ুনঃ
Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.